বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার পথে নতুন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো সন্দেহভাজন পাচারকারীর আর্থিক তথ্য সংগ্রহের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলেই অভিযুক্তরা দ্রুত সেই অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে ফেলছে। ফলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হারিয়ে যাচ্ছে, আইনি প্রমাণ সংগ্রহ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে অর্থ উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়া। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (এমএলএ) চুক্তির পরিধি সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির ২৮তম সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিসইনভয়েসিং—অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি দেখানোর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। বিদেশে তথ্য চাওয়ার আবেদন প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পরে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এই সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তরা অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনাও কমে আসে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এতে তথ্য আদান-প্রদান দ্রুত হবে এবং পাচারকারীদের অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আগেও সহযোগিতা ছিল। সাম্প্রতিক বৈঠকে সেই সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং বিদ্যমান কাঠামোকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সরকারি সূত্র জানায়, পাচারের অর্থ উদ্ধারে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা বা এমএলএ চুক্তিকে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং (চীন) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয়, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, সুশাসন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন করে অর্থ পাচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক স্বয়ংক্রিয় আর্থিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস)’-এ যুক্ত হতে না পারায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফেরত আনার কাজ আরও কঠিন হয়ে রয়েছে।
শিরোনাম :
পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০২:০৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- 22
ট্যাগস
অর্থ পাচার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এমএলএ চুক্তি পাচারের অর্থ উদ্ধার পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ বিএফআইইউ বিদেশে অর্থ পাচার মানি লন্ডারিং সিআরএস
জনপ্রিয় সংবাদ



























