বাংলাদেশের জন্মের পর ফের এক বড় ভূখণ্ড হারানোর মুখে পাকিস্তান। দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত সংগ্রামের পর বালোচ নেতৃত্ব ঘোষণা করল, আগামী ১১ আগস্ট পালিত হবে স্বাধীন বালোচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গোটা বালোচ জাতিকে এই বিশেষ দিনটি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে স্বাধীন বালোচিস্তানকে সমর্থনের অনুরোধ রাখা হয়েছে।
বালোচ লিবারেশন আর্মির শীর্ষ নেতা মির ইয়ার বালোচ জানিয়েছেন, ১১ আগস্ট বালোচিস্তানের প্রতিটি নাগরিককে নিজের ঘরের ছাদে জাতীয় পতাকা তুলতে অনুরোধ করা হয়েছে। শুধু বাড়ি নয়, পাড়া-মহল্লা, বাজার, দোকানপাট থেকে শুরু করে জনসমাগমপূর্ণ প্রতিটি এলাকায় ওড়ানো হবে রিপাবলিক অফ বালোচিস্তানের পতাকা। তাঁর ভাষায়, এখন থেকে প্রতিবছর এই দিনটিই হয়ে উঠবে বালোচ জাতির আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিবস। প্রবাসে থাকা বালোচ সম্প্রদায়কেও এই উদযাপনে শামিল হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে।
কেন বেছে নেওয়া হল ঠিক এই তারিখটিকেই? এর নেপথ্যে রয়েছে ইতিহাসের এক পুরনো অধ্যায়। ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট, ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল কাটিয়ে বিশ্বের দরবারে নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিল বালোচিস্তান। সে সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এই খবর গুরুত্ব পেয়েছিল। তখনও পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হয়নি— পাকিস্তান স্বাধীনতা পায় তার তিনদিন পর, ১৪ আগস্ট, আর ভারত স্বাধীন হয় ১৫ আগস্ট। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই ১১ আগস্টকে নিজেদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে বেছে নিয়েছে বালোচ নেতৃত্ব।
বিবৃতিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মির ইয়ার বালোচ। তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তানের নীতি শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বজুড়েই ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে। অধিকৃত কাশ্মীরে নির্যাতন, বালোচিস্তানে সামরিক অভিযান, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কিংবা পারমাণবিক পরীক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের ভূমিকা রক্তপাত আর অস্থিরতা বাড়িয়েছে বলে দাবি তাঁর। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে থেকে বালোচিস্তানের কোনওদিনও প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই গোটা বিশ্বের কাছে তাঁর আবেদন, শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বালোচিস্তানকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
বালোচিস্তানে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে বালোচ লিবারেশন আর্মি। বিপুল সেনাবাহিনী নামিয়েও এই লড়াই দমন করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পাকিস্তানি সেনাকে। পালটা কৌশল হিসেবে গুম, হত্যা ও ধর্ষণের মতো নির্মম দমনপীড়ন চালিয়ে বিদ্রোহের আগুন নেভানোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ, এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষত চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খনিজ সম্পদে ভরপুর এই প্রদেশকে কার্যত শোষণ করে চলেছে পাক প্রশাসন, অথচ বিনিময়ে বালোচ জনগণের ভাগ্যে জুটেছে শুধু দারিদ্র আর নিপীড়ন। এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর বঞ্চনার প্রতিবাদেই এবার চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বালোচ জনগণ, এমনটাই দাবি নেতৃত্বের।
এই ঘোষণার ফলে পাকিস্তানের উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, বালোচিস্তান সত্যিই বিচ্ছিন্ন হলে তা হবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক ক্ষতি। প্রায় ষাট লক্ষ বালোচ জনগণের ভবিষ্যৎ ঘিরে এই ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। যদিও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত কোনও রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি, এবং পাকিস্তান সরকারের তরফেও এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। মির ইয়ার বালোচ এবং তাঁর সংগঠন অতীতেও একাধিকবার একই ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবে জাতিসংঘ বা কোনও বড় শক্তিধর দেশ এখনও পর্যন্ত বালোচিস্তানকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করেনি। ফলে এই ঘোষণা কূটনৈতিক ও আইনি দিক থেকে ঠিক কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তবে মাটির লড়াইয়ের বাস্তবতা যাই হোক না কেন, এই ঘোষণা বালোচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কাছে এক আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। বহু প্রজন্ম ধরে চলা এই সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১১ আগস্ট তারিখটি এখন বালোচ জনগণের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আগামী দিনে এই আন্দোলন কোন দিকে গড়ায়, আর আন্তর্জাতিক মহল এই দাবির প্রতি কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেদিকেই এখন নজর গোটা বিশ্বের।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















