পাকিস্তানের লাহোরে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে হিন্দু ও জৈন আমলের প্রাচীন নাম

লাহোরে ফিরছে কৃষ্ণনগর-ধরমপুরা: ওপার বাংলার সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক

অনলাইন ডেস্ক | 

২৩ মে ২০২৬

দেশভাগের প্রায় আট দশক পর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার তাদের সাংস্কৃতিক রাজধানী লাহোরের বহুসাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা ইসলামীকরণের প্রক্রিয়ায় যেসব প্রাচীন রাস্তা, চক বা এলাকার নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেগুলোতে আবারও দেশভাগ-পূর্ব হিন্দু, শিখ এবং জৈন নামগুলো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

​পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়ম নওয়াজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই ‘হেরিটেজ রিভাইভাল প্রজেক্ট’ বা ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক নাম বদলের আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক মিশ্র ও কৌতুকপূর্ণ প্রতিক্রিয়া।

​ঐতিহ্যে ফিরছে লাহোর

​লাহোর বরাবরই তার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য পরিচিত ছিল। নতুন এই প্রকল্পের আওতায়, লাহোরের সুপরিচিত ‘ইসলামপুরা’ এলাকার নাম পরিবর্তন করে আবারও তার পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নাম ‘কৃষ্ণনগর’ রাখা হয়েছে। একইভাবে ‘মুস্তাফাবাদ’ এলাকাটি ফিরে পেয়েছে তার আদি নাম ‘ধরমপুরা’।

​শুধু আবাসন বা এলাকাই নয়, ঐতিহাসিক মোড় বা চকগুলোর নামও বদলে যাচ্ছে। বিতর্কিত ‘বাবরি মসজিদ চক’ পুনরায় রূপান্তরিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘জৈন মন্দির চকে’। এছাড়া বিখ্যাত ‘মৌলানা জাফর আলি চক’ তার আদি নাম ‘লক্ষ্মী চক’ এবং ‘রেহমান গলি’ এখন থেকে ‘রামগলি’ নামে অফিশিয়াল স্বীকৃতি পেয়েছে।

​পাঞ্জাব সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ এবং ঐতিহ্যপ্রেমীরা স্বাগত জানালেও, রক্ষণশীল মহলে এটি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

​বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার ঝড়

​ভারত ও বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনগুলোতে এক অভাবনীয় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

​বাংলাদেশের নেটিজেনদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক এবং সভ্যতার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নামের চেয়ে মাটির আদি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক বেশি শক্তিশালী।

​তবে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে কিছু ধর্মীয় ও রক্ষণশীল ফেসবুক গ্রুপ এবং কমেন্ট বক্সে। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভেতরে থাকা কট্টর পাকিস্তান-পন্থী বা নির্দিষ্ট একটি রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে তীব্র হতাশ করেছে। অনেকেই খোদ পাকিস্তানের এই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘উদারপন্থী’ নীতির ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কেন অমুসলিম নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে—এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো কান্নার রোল ও ‘হা-হা’ ইমোজির বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

​ট্রল ও মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব

​উগ্র আধুনিকতা বনাম অন্ধ ধর্মীয় আবেগের এই লড়াইয়ে নেটিজেনদের একাংশ বিষয়টিকে চরম হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছেন। অনেকে ট্রল করে লিখছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কিছু মানুষের এমন অবস্থা হয়েছে যেন তাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে এমন গুঞ্জন ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও ঘুরপাক খাচ্ছে যে, “পাকিস্তানের এই রূপ পরিবর্তনে চরম মানসিক দুঃখে অনেকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।”

​বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অন্য একটি দেশের অভ্যন্তরীণ হেরিটেজ প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের একটি মহলের এমন উগ্র উন্মাদনা মূলত চরম রাজনৈতিক ও মানসিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। দিনশেষে ইতিহাস যে তার নিজের গতিতেই চলে এবং জোরপূর্বক কোনো পরিচয় চাপিয়ে রাখা যায় না, লাহোরের এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা আসামির হাতে হাতকড়া

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

পাকিস্তানের লাহোরে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে হিন্দু ও জৈন আমলের প্রাচীন নাম

আপডেট সময় ০৮:৩০:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

লাহোরে ফিরছে কৃষ্ণনগর-ধরমপুরা: ওপার বাংলার সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক

অনলাইন ডেস্ক | 

২৩ মে ২০২৬

দেশভাগের প্রায় আট দশক পর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার তাদের সাংস্কৃতিক রাজধানী লাহোরের বহুসাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা ইসলামীকরণের প্রক্রিয়ায় যেসব প্রাচীন রাস্তা, চক বা এলাকার নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেগুলোতে আবারও দেশভাগ-পূর্ব হিন্দু, শিখ এবং জৈন নামগুলো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

​পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়ম নওয়াজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই ‘হেরিটেজ রিভাইভাল প্রজেক্ট’ বা ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক নাম বদলের আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক মিশ্র ও কৌতুকপূর্ণ প্রতিক্রিয়া।

​ঐতিহ্যে ফিরছে লাহোর

​লাহোর বরাবরই তার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য পরিচিত ছিল। নতুন এই প্রকল্পের আওতায়, লাহোরের সুপরিচিত ‘ইসলামপুরা’ এলাকার নাম পরিবর্তন করে আবারও তার পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নাম ‘কৃষ্ণনগর’ রাখা হয়েছে। একইভাবে ‘মুস্তাফাবাদ’ এলাকাটি ফিরে পেয়েছে তার আদি নাম ‘ধরমপুরা’।

​শুধু আবাসন বা এলাকাই নয়, ঐতিহাসিক মোড় বা চকগুলোর নামও বদলে যাচ্ছে। বিতর্কিত ‘বাবরি মসজিদ চক’ পুনরায় রূপান্তরিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘জৈন মন্দির চকে’। এছাড়া বিখ্যাত ‘মৌলানা জাফর আলি চক’ তার আদি নাম ‘লক্ষ্মী চক’ এবং ‘রেহমান গলি’ এখন থেকে ‘রামগলি’ নামে অফিশিয়াল স্বীকৃতি পেয়েছে।

​পাঞ্জাব সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ এবং ঐতিহ্যপ্রেমীরা স্বাগত জানালেও, রক্ষণশীল মহলে এটি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

​বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার ঝড়

​ভারত ও বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনগুলোতে এক অভাবনীয় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

​বাংলাদেশের নেটিজেনদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক এবং সভ্যতার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নামের চেয়ে মাটির আদি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক বেশি শক্তিশালী।

​তবে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে কিছু ধর্মীয় ও রক্ষণশীল ফেসবুক গ্রুপ এবং কমেন্ট বক্সে। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভেতরে থাকা কট্টর পাকিস্তান-পন্থী বা নির্দিষ্ট একটি রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে তীব্র হতাশ করেছে। অনেকেই খোদ পাকিস্তানের এই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘উদারপন্থী’ নীতির ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কেন অমুসলিম নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে—এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো কান্নার রোল ও ‘হা-হা’ ইমোজির বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

​ট্রল ও মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব

​উগ্র আধুনিকতা বনাম অন্ধ ধর্মীয় আবেগের এই লড়াইয়ে নেটিজেনদের একাংশ বিষয়টিকে চরম হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছেন। অনেকে ট্রল করে লিখছেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কিছু মানুষের এমন অবস্থা হয়েছে যেন তাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে এমন গুঞ্জন ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও ঘুরপাক খাচ্ছে যে, “পাকিস্তানের এই রূপ পরিবর্তনে চরম মানসিক দুঃখে অনেকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।”

​বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অন্য একটি দেশের অভ্যন্তরীণ হেরিটেজ প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের একটি মহলের এমন উগ্র উন্মাদনা মূলত চরম রাজনৈতিক ও মানসিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। দিনশেষে ইতিহাস যে তার নিজের গতিতেই চলে এবং জোরপূর্বক কোনো পরিচয় চাপিয়ে রাখা যায় না, লাহোরের এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।

Share this news as a Photo Card