ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন থেকে সৌরবিদ্যুতেই চার্জ করতে হবে, না হলে মিলবে না রেজিস্ট্রেশন—এমনই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে বড় সড়ক পর্যন্ত ছেয়ে থাকা এই বাহনগুলোকে এখন শৃঙ্খলার আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার, আর সেই শৃঙ্খলার প্রথম শর্তই হলো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার।
সোমবার সকাল ১০টায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এক পর্যালোচনা সভা, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় সচিব মো. শহীদুল হাসান। উপস্থিত ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব শওকত রশীদ চৌধুরীও। সভায় উঠে আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নানা দিক।
তবে আলোচনার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে ব্যাটারিচালিত রিকশার রেজিস্ট্রেশন প্রসঙ্গ। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে ব্যাটারি রিচার্জ করা হলে সেই রিকশা রেজিস্ট্রেশনের যোগ্যতা হারাবে। তার ভাষায়, রিচার্জ অবশ্যই সৌরবিদ্যুতে হতে হবে, আর এই শর্ত নিশ্চিত করার দায়িত্ব পড়বে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোর ওপর। বিধিমালা প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
এখন থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার রেজিস্ট্রেশন আর দেবে না বিআরটিএ। এই দায়িত্ব যাবে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার হাতে, যার আইনি ভিত্তি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সেই আইনের আলোকেই তৈরি হচ্ছে বিস্তারিত বিধিমালা, যেখানে থাকবে রেজিস্ট্রেশন ফি, নবায়ন ফি এবং প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তের বিবরণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উঠে এসেছে ফিটনেস সার্টিফিকেটের বিষয়টি। বুয়েট, সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জেলা পর্যায়ের ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটগুলোর অটোমোবাইল শাখা থেকে ফিটনেস সনদ নিতে হবে প্রতিটি রিকশার জন্য। এই সনদ দেওয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্ধারিত ফি পাবে, যা ঠিক করে দেবে সরকার নিজেই। ফিটনেস সনদ নিয়ে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় গেলে, নির্ধারিত ফি পরিশোধ সাপেক্ষে মিলবে রেজিস্ট্রেশন। তবে এই স্বীকৃতি স্থায়ী নয়—এক বছর পর নবায়নের সময় আবারও দেখাতে হবে ফিটনেস সনদ, নিতে হবে নতুন করে অনুমোদন।
রাজধানী ঢাকাকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজাতে গোটা শহরকে ভাগ করা হচ্ছে আটটি জোনে—দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে। আইনি পরিভাষায় এই বাহনগুলোকে বলা হচ্ছে ই-রিকশা। প্রতিটি জোনের জন্য থাকবে আলাদা রং, যাতে এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ করতে না পারে। এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে ব্যবহার করা হবে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলেই শনাক্ত হয়ে যাবে বাহনটি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে বৈঠকে বসেছে ট্রাফিক পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। প্রতিমন্ত্রী জানান, বিধিমালা অনুমোদনের পরপরই বিস্তারিত জানানো হবে জনসাধারণকে। জরুরি ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে যৌথ উদ্যোগ নেবে সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ। কোন রুটে কোন জোনের রিকশা চলাচল করতে পারবে, আর কোনটি পারবে না—তারও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে নতুন বিধিমালায়।
শুধু নিয়ম তৈরিই নয়, লঙ্ঘনের শাস্তিও নির্ধারিত হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের বাইরে অন্য কোনো উৎস থেকে ব্যাটারি রিচার্জ করলে জরিমানার বিধানও রাখা হচ্ছে আইনে। সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই যান।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আশ্বস্ত করেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে পারে এই বিধিমালা। তখনই স্পষ্ট হবে ফি কাঠামো, জোন বিভাজনের বিস্তারিত নকশা এবং প্রয়োগের সময়সূচি। ততদিন পর্যন্ত রাজধানীর লাখো ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ও যাত্রীদের নজর থাকবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে যেমন কমবে বিদ্যুতের ওপর চাপ, তেমনি রাজধানীর সড়কে ফিরতে পারে কিছুটা শৃঙ্খলা। তবে বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়—লাখো রিকশাচালককে সৌরচার্জিং ব্যবস্থার আওতায় আনা, প্রতিটি বাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করানো এবং জোনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর রাখা— সবকিছুই নির্ভর করছে প্রশাসনিক তৎপরতা ও সমন্বয়ের ওপর। আগামী দিনগুলোতেই বোঝা যাবে, কাগজে-কলমে তৈরি এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 






















