শিরোনাম :
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে: রেজিস্ট্রেশন,সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক সহ একগুচ্ছ শর্ত সরকারের ১৮০ দিন: অর্জন, ব্যর্থতা আর অমীমাংসিত প্রশ্নের নিকাশ কিশোরগঞ্জে মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নতুন পে-স্কেল প্রস্তুত, ঘোষণা যেকোনো সময়: মুখ্য সচিব অনুকূল পরিবেশ ছাড়া ভারত যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঐতিহাসিক জয়ের পর বদলে গেল পয়েন্ট টেবিল, কত নম্বরে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস গড়া টেস্ট জয় যেসব কারণে ঢাকার যানজট,সমাধান হবে কি কোনদিন? মাদারীপুরে মাদ্রাসায় ককটেল বিস্ফোরণে আহত ৫ শিক্ষার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হলেন নতুন চার নেতা

সরকারের ১৮০ দিন: অর্জন, ব্যর্থতা আর অমীমাংসিত প্রশ্নের নিকাশ

ক্ষমতার প্রথম ১৮০ দিন পার করলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত আর নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরাধিকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে চলছে জোর মূল্যায়ন। কারও চোখে এই সময়টা অর্জনে ভরা, আবার কারও কাছে তা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার গল্প।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দেড় বছর দায়িত্বে ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময়টায় জুলাইয়ের পক্ষে থাকা ডান-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একধরনের অঘোষিত ঐক্য দেখা গিয়েছিল, যদিও কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার উত্থান নিয়ে অভিযোগও উঠেছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও প্রতিপক্ষের দিক থেকে ভিন্নমতের প্রতি বিষোদগার আর বাধা দেওয়ার ঘটনা সে সময় আলোচনায় এসেছিল বারবার। আদালত চত্বরে আসামিদের ওপর হামলা, মব সহিংসতা আর নারীদের প্রতি স্লাটশেমিংয়ের একাধিক ঘটনা নিয়ে যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড়, তখন একটি পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—নির্বাচিত সরকার এলে এই পরিস্থিতির বদল ঘটবে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান এবং গঠিত হয় নতুন সরকার। শপথ নেওয়ার পরদিনই ঘোষণা করা হয় ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা। ১৬ আগস্ট সেই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে—গণতন্ত্র কতটা ফিরলো, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত হলো, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার হাল কেমন, আর মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব কতটা মিললো।

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নিয়ে দুই বিপরীত মূল্যায়ন

রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এই ছয় মাসের মূল্যায়ন মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি পক্ষের দাবি, এই সময়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে। ১৫ আগস্ট নয়াপল্টনে দলের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলে বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন এবং বর্তমান সরকারও সেই গণতন্ত্রকেই ধারণ করে চলেছে। তার ভাষায়, আগামী দিনে খালেদা জিয়ার আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনায়ই দেশ পরিচালিত হবে।

অন্য পক্ষের বক্তব্য একেবারে ভিন্ন। তাদের মতে, একটি ভালো নির্বাচন মানেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়। মানুষের জীবনযাত্রার প্রত্যাশা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে কতটা আলোচনা হচ্ছে, সেটিও দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি মব সংস্কৃতি খুব একটা কমেনি বলে অভিযোগ উঠছে। রাজনৈতিক কারণে এখনও অনেক গণমাধ্যমকর্মী কারাগারে আছেন এবং অনেককে হত্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা আর সংসদে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি নিয়ে আলোচনা না হওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলেই মনে করেন এই অংশ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে, মানুষ ভোট দিতে পেরেছে—এটি ইতিবাচক দিক। তবে তার মতে, গণতন্ত্র মানেই কেবল ভালো নির্বাচন নয়, কারণ এখনও জনগণের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা না হওয়া, শিক্ষাঙ্গনে মব আতঙ্ক আর মামলা-গ্রেফতার বাণিজ্য—এসব বিবেচনায় নিলে গণতান্ত্রিক ধারায় খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না।

কথা আর কাজে কতটা মিল

সরকারের ১৮০ দিনে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আসলে কতটুকু হয়েছে—এই প্রশ্নে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইফুল হক বলেন, এই সময়ে মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে, যা তার ভাষায় বড় অর্জন। তিনি বলেন, বৈধ কোনো দলের কাউকে মতপ্রকাশের জন্য গ্রেফতার করা হচ্ছে না, বিরোধীদলগুলো অবাধে সভা-সমাবেশ করলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে না এবং তারা সংসদের ভেতরে-বাইরে স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাষ্ট্রীয় গুমও নেই বলে তিনি জানান। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটছে—বিশেষ করে সাময়িক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সম্মান জানাতে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তার মতে, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ না থাকলে গ্রেফতারের কোনো সুযোগ নেই।

তবে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন। তিনি বলেন, ১৮০ দিনে সরকার অতীতের ধারাবাহিকতাতেই দেশ চালিয়েছে এবং আগের মতোই লুটেরা শ্রেণি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। তার অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট আর নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি চলছেই, আর মার্কিন চুক্তি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো বারবার সমাধানের কথা বললেও সরকার তা উপেক্ষাই করে আসছে। তার মন্তব্য, সরকার সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে এসব মতামতকে গুরুত্ব দিত।

সাংবিধানিক নিয়োগ ও বিরোধীদের প্রশ্ন

প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা এই সময়টা নিয়ে দিয়েছেন একেবারে ভিন্ন ব্যাখ্যা। তাদের অভিযোগ, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন—সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসানো হয়েছে দলীয় নেতাদের, সংসদে পাস হচ্ছে একতরফা আইন, বিরোধীদলের মতামতকে দেওয়া হচ্ছে না গুরুত্ব, আর উন্নয়ন বরাদ্দেও চলছে বৈষম্য।

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, গণতন্ত্র নিয়ে সরকার মুখে একরকম কথা বললেও কাজে-কর্মে চলছে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আচরণ। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার হচ্ছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বসানো হয়েছে নিজেদের লোকজন, আর বিরোধীদলের কর্মসূচিতে দেওয়া হচ্ছে বাধা। তার দাবি, সিলেট ও হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালালেও উল্টো মামলা করা হয়েছে আক্রান্তদের বিরুদ্ধে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে এবং সংসদে পাস হচ্ছে একতরফা আইন। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও তার মন্তব্য। তার ভাষায়, সরকার গণতন্ত্র বলতে বোঝায় কেবল নিজেদের স্বার্থকেই।

একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, সরকার মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন, কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি অর্থ খরচ করে পোস্টার-ব্যানার বানিয়ে চলছে নিজেদের প্রচারণা। তার নিজের নির্বাচনি এলাকার একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য পদে বিএনপির দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। উন্নয়ন বরাদ্দেও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তার অভিযোগ।

ক্ষমতাসীনদের ভিন্ন দাবি

বিরোধী পক্ষের নানা সমালোচনার বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দাবি, এই সময়ে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে এবং আগের মতো প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। সংসদেও বিরোধীদলকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের বক্তব্য।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহাম্মেদ বলেন, ছয় মাসে দেশের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ গণমুখী নানা কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে সরকার। তার আক্ষেপ, বিরোধীদল এসব বিষয়ে ইতিবাচক প্রশংসা না করে কেবল গণতন্ত্র নেই বলে হইচই করছে। তিনি মনে করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষ এখন মুক্তভাবে কথা বলতে পারছে এবং সরকার কারও মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে না, যেখানে অতীতে সরকারের বিপক্ষে কথা বললেই মামলা দেওয়া হতো। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চান বলেই সংসদে বিরোধীদলকে তাদের প্রাপ্য কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী দিনে সরকার গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, তারেক রহমান একরকম ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন, যেখানে সবকিছুই ছিল এলোমেলো। তিনি ধীরে ধীরে সবকিছু ঢেলে সাজাচ্ছেন বলে তার মন্তব্য। তিনি বলেন, সবাই সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন এবং বিরোধীদলও স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে। বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে ছিল বলেই তারা অন্যের মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে তার ভাষ্য।

সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোগ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, গ্যাসের অপর্যাপ্ততা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মতো একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করেছে সরকার। তবে এই সময়ের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের দৃশ্যমান তৎপরতাও লক্ষ করা গেছে।

নীতিগত অনেক উদ্যোগের সুফল এখনও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করছে বলে তাদের অভিমত। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, জননিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান এখনও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন এবং মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনকে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ছুটির দিনেও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং দেশজুড়ে উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সরকারে গতির সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

প্রথম ছয় মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য ফার্মার কার্ড চালু, কৃষিঋণ মওকুফ, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পদক্ষেপ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের বোঝা না বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় বাজেট পেশ করাকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করাকে সাফল্যের তালিকায় রাখছে সরকার নিজেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের মতো প্রকল্পও।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার নিয়েছে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্টরা, আর বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহকেও অর্থনীতির প্রতি আস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, দুই দশকের ‘অপশাসনের’ পর দায়িত্ব নিয়ে সরকার শুরু থেকেই সংকট নিরসনে কাজ করছে। তিনি বলেন, ছয় মাস খুব অল্প সময়, আগামী ছয় মাসে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছিল এবং সরকার তা সমাধানে কাজ করছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সংকট কেটে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামনে আরও কাজ

এত উদ্যোগের পরও জীবনযাত্রার ব্যয় সরকারের জন্য দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে। নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজারে তার কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এখনও মেলেনি। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কারও দাঁড়িয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে। অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আস্থা সংকটে জর্জরিত এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ শুরু হলেও এখনও তাতে গতি আসেনি। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিও সরকারের জন্য দাঁড়িয়েছে বড় পরীক্ষা হয়ে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার, যদিও মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল পাওয়া কঠিন। ফলে আগামী ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার।

প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের সব স্তর প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেখানো গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারছে না বলে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের গতি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন। তাদের মতে, এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজ করার সদিচ্ছা নয়, সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও জরুরি।

রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নও সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মিত্রদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সংবিধান সংস্কার এবং আগের সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে আরও সক্রিয় যোগাযোগ প্রয়োজন। ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি যে ‘রেইনবো নেশন’ বা ‘রংধনু জাতি’র ধারণার কথা বলেছিল, রাষ্ট্রের কাঠামো ও কার্যক্রমে তার আরও দৃশ্যমান প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

বিশ্লেষকদের চোখে ছয় মাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডে তিনি সন্তুষ্ট নন। তার ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর যে সমস্যাগুলো ছিল, তার মধ্যে মব সহিংসতাও রয়েছে, যা এখনও বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি সংকট মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার পুরোপুরি প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। তবে ছয় মাস খুবই অল্প সময় বলে তিনি মনে করেন এবং আগামী ছয় মাসে সরকার কী করে, সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে তার মন্তব্য।

সাইফুল হক সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় জরুরি সেবা প্রদান এবং দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে বাজেট ঘোষণা করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

গত ১৮ জুলাই সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পাঁচ মাসে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রথম দেড়শ দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং এই সময়েই সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বলেছেন, বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অতীতে সূচক ইতিবাচক ধারায় ছিল, যা গত ষোলো বছরে ধূলিসাৎ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ ফেরাতে কাজ করছে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ছয় মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মাহদী আমিন জানিয়েছেন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের মধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই নারীকেন্দ্রিক ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং বড় আকারে চালু হয়েছে কৃষক কার্ড। একই সঙ্গে প্রবাসী কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, ফুয়েল পাস, এলপিজি কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড নিয়ে চলছে আলোচনা। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। অচল ডেমু সচল করা, নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে বলা হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব অর্জনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং প্রকাশিত একটি ই-বুক অনুযায়ী, প্রথম একশ দিনের মধ্যে প্রায় দুইশ উদ্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যার ফলে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সরকার দেড়শ দিনে সব মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির কথা বললেও বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনদুর্ভোগ কমানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সংস্কৃতি বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসন পরিচালনায় ব্যর্থতা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অক্ষমতার কারণে সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

মূল্যায়ন কেন জরুরি

ছয় মাস পূর্তির পর সরকারের নজর এখন দৃশ্যমান বাস্তবায়নে। ১৬ আগস্টকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় রদবদলের জোর গুঞ্জন চলছে এবং একাধিক মুখ বাদ পড়তে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকারের ছয় মাসের অঙ্গীকারের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। ১৪ আগস্ট নয়াপল্টনে খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি নিয়ে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোথাও হয়তো শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি, তবে নব্বই বা পঁচানব্বই শতাংশ হয়েছে। ছয় মাস পূর্তিতে অঙ্গীকারগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তার একটি লিখিত বিবরণও দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। প্রথম ছয় মাসকে প্রস্তুতি ও প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার সময় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

তবে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা কেবল ছয় মাসের অগ্রগতি যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের পুরো মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে মূল্যায়ন করা খুবই জরুরি। তিনি বলেন, এটি কেবল বাংলাদেশেই হয় এমন নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও একই রকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মূল্যায়নের প্রধান কারণ হলো, সরকারকে তার মূল কাজ, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের প্রয়োজনের দিকে মনোযোগী রাখা। তার মতে, অঙ্গীকার অনুযায়ী কী অর্জন হয়েছে, কাজের মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়াগত মূল্যায়নের মাধ্যমে সরকারকে জনস্বার্থে কাজের গতি বাড়ানো এবং মূল অঙ্গীকারের ধারায় সক্রিয় রাখা যায়, যদিও অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনো সরকারই ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বা পাঁচ বছরের মূল্যায়নকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তিনি মনে করেন, ৫ আগস্টের পর এটিই প্রথম নির্বাচিত সরকার হওয়ায় এই সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গাটি আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন এবং সমালোচনার বিষয়গুলো সাদরে গ্রহণ করে সংশোধন ও নতুন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মূল্যায়ন করা জরুরি, কারণ ক্ষমতার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তা কুক্ষিগত হওয়া এবং অপব্যবহৃত হওয়া। তার ভাষায়, সরকারের হাতে অগাধ ক্ষমতা এবং বৈধভাবে বল প্রয়োগের ক্ষমতাও থাকে বলে নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই নজরদারির জন্য সংসদ একটি কাঠামো, বিচারব্যবস্থা আরেকটি কাঠামো, এছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নিশ্চিত করে সরকার যেন কোনো অন্যায় না করে, ক্ষমতার অপব্যবহার না করে এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও এই নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তিনি মনে করেন।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, মূল্যায়ন কেবল বছরভিত্তিক জরুরি নয়, বরং প্রথম দিন থেকেই হতে পারে। তার মতে, মূল্যায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে মানুষ পরে মূল্যায়ন করে, কারণ সবকিছুরই একটি ‘হানিমুন পিরিয়ড’ থাকে এবং ছয় মাস হয়তো খাপ খাওয়াতে ও বিষয়গুলো বুঝতে সময় লাগে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, প্রথম দিন থেকেই সরকারের মূল্যায়ন করা উচিত এবং যখনই ভুল হবে, তখনই প্রতিবাদ করা উচিত, আবার ভালো কিছু হলে তখনই প্রশংসাও করা উচিত। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিলেন বলেই হয়তো ছয় মাস পর সবাই বিচার-বিশ্লেষণ করছে, সরকার যতটা এগোতে চেয়েছিল ততটা এগোতে পেরেছে কিনা। তার শেষ কথা, এ ধরনের সময়সীমার খুব একটা অর্থ নেই—প্রতিদিনই সরকারের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে হবে এবং প্রতিদিনই এক ধরনের জবাবদিহি থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে সরকারের ১৮০ দিনের চিত্রটি একরৈখিক নয়। এক পক্ষ দেখছে ভোটাধিকার ফেরা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল আর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মতো অর্জন; আরেক পক্ষ দেখছে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, মব সংস্কৃতি আর প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের মতো ব্যর্থতা। প্রতিশ্রুত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা বাস্তবে রূপ নিলো, আর আগামী দিনে সেই গতি কতটা ধরে রাখা যায়—সেটিই এখন নির্ধারণ করবে সরকারের পরবর্তী পথচলা।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে: রেজিস্ট্রেশন,সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক সহ একগুচ্ছ শর্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হলেন নতুন চার নেতা

১৫ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

সরকারের ১৮০ দিন: অর্জন, ব্যর্থতা আর অমীমাংসিত প্রশ্নের নিকাশ

আপডেট সময় ০১:০৩:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ক্ষমতার প্রথম ১৮০ দিন পার করলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত আর নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরাধিকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে চলছে জোর মূল্যায়ন। কারও চোখে এই সময়টা অর্জনে ভরা, আবার কারও কাছে তা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার গল্প।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দেড় বছর দায়িত্বে ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময়টায় জুলাইয়ের পক্ষে থাকা ডান-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একধরনের অঘোষিত ঐক্য দেখা গিয়েছিল, যদিও কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার উত্থান নিয়ে অভিযোগও উঠেছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও প্রতিপক্ষের দিক থেকে ভিন্নমতের প্রতি বিষোদগার আর বাধা দেওয়ার ঘটনা সে সময় আলোচনায় এসেছিল বারবার। আদালত চত্বরে আসামিদের ওপর হামলা, মব সহিংসতা আর নারীদের প্রতি স্লাটশেমিংয়ের একাধিক ঘটনা নিয়ে যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড়, তখন একটি পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—নির্বাচিত সরকার এলে এই পরিস্থিতির বদল ঘটবে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান এবং গঠিত হয় নতুন সরকার। শপথ নেওয়ার পরদিনই ঘোষণা করা হয় ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা। ১৬ আগস্ট সেই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে—গণতন্ত্র কতটা ফিরলো, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত হলো, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার হাল কেমন, আর মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব কতটা মিললো।

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নিয়ে দুই বিপরীত মূল্যায়ন

রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এই ছয় মাসের মূল্যায়ন মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি পক্ষের দাবি, এই সময়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে। ১৫ আগস্ট নয়াপল্টনে দলের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলে বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন এবং বর্তমান সরকারও সেই গণতন্ত্রকেই ধারণ করে চলেছে। তার ভাষায়, আগামী দিনে খালেদা জিয়ার আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনায়ই দেশ পরিচালিত হবে।

অন্য পক্ষের বক্তব্য একেবারে ভিন্ন। তাদের মতে, একটি ভালো নির্বাচন মানেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়। মানুষের জীবনযাত্রার প্রত্যাশা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে কতটা আলোচনা হচ্ছে, সেটিও দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি মব সংস্কৃতি খুব একটা কমেনি বলে অভিযোগ উঠছে। রাজনৈতিক কারণে এখনও অনেক গণমাধ্যমকর্মী কারাগারে আছেন এবং অনেককে হত্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা আর সংসদে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি নিয়ে আলোচনা না হওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলেই মনে করেন এই অংশ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে, মানুষ ভোট দিতে পেরেছে—এটি ইতিবাচক দিক। তবে তার মতে, গণতন্ত্র মানেই কেবল ভালো নির্বাচন নয়, কারণ এখনও জনগণের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা না হওয়া, শিক্ষাঙ্গনে মব আতঙ্ক আর মামলা-গ্রেফতার বাণিজ্য—এসব বিবেচনায় নিলে গণতান্ত্রিক ধারায় খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না।

কথা আর কাজে কতটা মিল

সরকারের ১৮০ দিনে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আসলে কতটুকু হয়েছে—এই প্রশ্নে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইফুল হক বলেন, এই সময়ে মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে, যা তার ভাষায় বড় অর্জন। তিনি বলেন, বৈধ কোনো দলের কাউকে মতপ্রকাশের জন্য গ্রেফতার করা হচ্ছে না, বিরোধীদলগুলো অবাধে সভা-সমাবেশ করলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে না এবং তারা সংসদের ভেতরে-বাইরে স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাষ্ট্রীয় গুমও নেই বলে তিনি জানান। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটছে—বিশেষ করে সাময়িক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সম্মান জানাতে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তার মতে, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ না থাকলে গ্রেফতারের কোনো সুযোগ নেই।

তবে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন। তিনি বলেন, ১৮০ দিনে সরকার অতীতের ধারাবাহিকতাতেই দেশ চালিয়েছে এবং আগের মতোই লুটেরা শ্রেণি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। তার অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট আর নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি চলছেই, আর মার্কিন চুক্তি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো বারবার সমাধানের কথা বললেও সরকার তা উপেক্ষাই করে আসছে। তার মন্তব্য, সরকার সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে এসব মতামতকে গুরুত্ব দিত।

সাংবিধানিক নিয়োগ ও বিরোধীদের প্রশ্ন

প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা এই সময়টা নিয়ে দিয়েছেন একেবারে ভিন্ন ব্যাখ্যা। তাদের অভিযোগ, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন—সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসানো হয়েছে দলীয় নেতাদের, সংসদে পাস হচ্ছে একতরফা আইন, বিরোধীদলের মতামতকে দেওয়া হচ্ছে না গুরুত্ব, আর উন্নয়ন বরাদ্দেও চলছে বৈষম্য।

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, গণতন্ত্র নিয়ে সরকার মুখে একরকম কথা বললেও কাজে-কর্মে চলছে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আচরণ। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার হচ্ছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বসানো হয়েছে নিজেদের লোকজন, আর বিরোধীদলের কর্মসূচিতে দেওয়া হচ্ছে বাধা। তার দাবি, সিলেট ও হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালালেও উল্টো মামলা করা হয়েছে আক্রান্তদের বিরুদ্ধে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে এবং সংসদে পাস হচ্ছে একতরফা আইন। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও তার মন্তব্য। তার ভাষায়, সরকার গণতন্ত্র বলতে বোঝায় কেবল নিজেদের স্বার্থকেই।

একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, সরকার মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন, কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি অর্থ খরচ করে পোস্টার-ব্যানার বানিয়ে চলছে নিজেদের প্রচারণা। তার নিজের নির্বাচনি এলাকার একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য পদে বিএনপির দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। উন্নয়ন বরাদ্দেও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তার অভিযোগ।

ক্ষমতাসীনদের ভিন্ন দাবি

বিরোধী পক্ষের নানা সমালোচনার বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দাবি, এই সময়ে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে এবং আগের মতো প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। সংসদেও বিরোধীদলকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের বক্তব্য।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহাম্মেদ বলেন, ছয় মাসে দেশের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ গণমুখী নানা কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে সরকার। তার আক্ষেপ, বিরোধীদল এসব বিষয়ে ইতিবাচক প্রশংসা না করে কেবল গণতন্ত্র নেই বলে হইচই করছে। তিনি মনে করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষ এখন মুক্তভাবে কথা বলতে পারছে এবং সরকার কারও মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে না, যেখানে অতীতে সরকারের বিপক্ষে কথা বললেই মামলা দেওয়া হতো। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চান বলেই সংসদে বিরোধীদলকে তাদের প্রাপ্য কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী দিনে সরকার গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, তারেক রহমান একরকম ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন, যেখানে সবকিছুই ছিল এলোমেলো। তিনি ধীরে ধীরে সবকিছু ঢেলে সাজাচ্ছেন বলে তার মন্তব্য। তিনি বলেন, সবাই সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন এবং বিরোধীদলও স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে। বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে ছিল বলেই তারা অন্যের মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে তার ভাষ্য।

সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোগ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, গ্যাসের অপর্যাপ্ততা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মতো একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করেছে সরকার। তবে এই সময়ের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের দৃশ্যমান তৎপরতাও লক্ষ করা গেছে।

নীতিগত অনেক উদ্যোগের সুফল এখনও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করছে বলে তাদের অভিমত। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, জননিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান এখনও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন এবং মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনকে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ছুটির দিনেও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং দেশজুড়ে উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সরকারে গতির সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

প্রথম ছয় মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য ফার্মার কার্ড চালু, কৃষিঋণ মওকুফ, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পদক্ষেপ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের বোঝা না বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় বাজেট পেশ করাকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করাকে সাফল্যের তালিকায় রাখছে সরকার নিজেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের মতো প্রকল্পও।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার নিয়েছে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্টরা, আর বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহকেও অর্থনীতির প্রতি আস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, দুই দশকের ‘অপশাসনের’ পর দায়িত্ব নিয়ে সরকার শুরু থেকেই সংকট নিরসনে কাজ করছে। তিনি বলেন, ছয় মাস খুব অল্প সময়, আগামী ছয় মাসে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছিল এবং সরকার তা সমাধানে কাজ করছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সংকট কেটে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামনে আরও কাজ

এত উদ্যোগের পরও জীবনযাত্রার ব্যয় সরকারের জন্য দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে। নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজারে তার কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এখনও মেলেনি। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কারও দাঁড়িয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে। অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আস্থা সংকটে জর্জরিত এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ শুরু হলেও এখনও তাতে গতি আসেনি। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিও সরকারের জন্য দাঁড়িয়েছে বড় পরীক্ষা হয়ে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার, যদিও মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল পাওয়া কঠিন। ফলে আগামী ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার।

প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের সব স্তর প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেখানো গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারছে না বলে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগের গতি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন। তাদের মতে, এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজ করার সদিচ্ছা নয়, সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও জরুরি।

রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নও সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মিত্রদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সংবিধান সংস্কার এবং আগের সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে আরও সক্রিয় যোগাযোগ প্রয়োজন। ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি যে ‘রেইনবো নেশন’ বা ‘রংধনু জাতি’র ধারণার কথা বলেছিল, রাষ্ট্রের কাঠামো ও কার্যক্রমে তার আরও দৃশ্যমান প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

বিশ্লেষকদের চোখে ছয় মাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডে তিনি সন্তুষ্ট নন। তার ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর যে সমস্যাগুলো ছিল, তার মধ্যে মব সহিংসতাও রয়েছে, যা এখনও বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি সংকট মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার পুরোপুরি প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। তবে ছয় মাস খুবই অল্প সময় বলে তিনি মনে করেন এবং আগামী ছয় মাসে সরকার কী করে, সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে তার মন্তব্য।

সাইফুল হক সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় জরুরি সেবা প্রদান এবং দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে বাজেট ঘোষণা করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

গত ১৮ জুলাই সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পাঁচ মাসে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রথম দেড়শ দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং এই সময়েই সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বলেছেন, বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অতীতে সূচক ইতিবাচক ধারায় ছিল, যা গত ষোলো বছরে ধূলিসাৎ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ ফেরাতে কাজ করছে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ছয় মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মাহদী আমিন জানিয়েছেন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের মধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই নারীকেন্দ্রিক ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং বড় আকারে চালু হয়েছে কৃষক কার্ড। একই সঙ্গে প্রবাসী কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, ফুয়েল পাস, এলপিজি কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড নিয়ে চলছে আলোচনা। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। অচল ডেমু সচল করা, নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে বলা হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব অর্জনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং প্রকাশিত একটি ই-বুক অনুযায়ী, প্রথম একশ দিনের মধ্যে প্রায় দুইশ উদ্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যার ফলে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সরকার দেড়শ দিনে সব মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির কথা বললেও বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনদুর্ভোগ কমানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সংস্কৃতি বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসন পরিচালনায় ব্যর্থতা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অক্ষমতার কারণে সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

মূল্যায়ন কেন জরুরি

ছয় মাস পূর্তির পর সরকারের নজর এখন দৃশ্যমান বাস্তবায়নে। ১৬ আগস্টকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় রদবদলের জোর গুঞ্জন চলছে এবং একাধিক মুখ বাদ পড়তে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকারের ছয় মাসের অঙ্গীকারের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। ১৪ আগস্ট নয়াপল্টনে খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি নিয়ে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোথাও হয়তো শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি, তবে নব্বই বা পঁচানব্বই শতাংশ হয়েছে। ছয় মাস পূর্তিতে অঙ্গীকারগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তার একটি লিখিত বিবরণও দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। প্রথম ছয় মাসকে প্রস্তুতি ও প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার সময় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

তবে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা কেবল ছয় মাসের অগ্রগতি যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের পুরো মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে মূল্যায়ন করা খুবই জরুরি। তিনি বলেন, এটি কেবল বাংলাদেশেই হয় এমন নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও একই রকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মূল্যায়নের প্রধান কারণ হলো, সরকারকে তার মূল কাজ, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের প্রয়োজনের দিকে মনোযোগী রাখা। তার মতে, অঙ্গীকার অনুযায়ী কী অর্জন হয়েছে, কাজের মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়াগত মূল্যায়নের মাধ্যমে সরকারকে জনস্বার্থে কাজের গতি বাড়ানো এবং মূল অঙ্গীকারের ধারায় সক্রিয় রাখা যায়, যদিও অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনো সরকারই ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বা পাঁচ বছরের মূল্যায়নকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তিনি মনে করেন, ৫ আগস্টের পর এটিই প্রথম নির্বাচিত সরকার হওয়ায় এই সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গাটি আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন এবং সমালোচনার বিষয়গুলো সাদরে গ্রহণ করে সংশোধন ও নতুন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মূল্যায়ন করা জরুরি, কারণ ক্ষমতার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তা কুক্ষিগত হওয়া এবং অপব্যবহৃত হওয়া। তার ভাষায়, সরকারের হাতে অগাধ ক্ষমতা এবং বৈধভাবে বল প্রয়োগের ক্ষমতাও থাকে বলে নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই নজরদারির জন্য সংসদ একটি কাঠামো, বিচারব্যবস্থা আরেকটি কাঠামো, এছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নিশ্চিত করে সরকার যেন কোনো অন্যায় না করে, ক্ষমতার অপব্যবহার না করে এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও এই নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তিনি মনে করেন।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, মূল্যায়ন কেবল বছরভিত্তিক জরুরি নয়, বরং প্রথম দিন থেকেই হতে পারে। তার মতে, মূল্যায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে মানুষ পরে মূল্যায়ন করে, কারণ সবকিছুরই একটি ‘হানিমুন পিরিয়ড’ থাকে এবং ছয় মাস হয়তো খাপ খাওয়াতে ও বিষয়গুলো বুঝতে সময় লাগে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, প্রথম দিন থেকেই সরকারের মূল্যায়ন করা উচিত এবং যখনই ভুল হবে, তখনই প্রতিবাদ করা উচিত, আবার ভালো কিছু হলে তখনই প্রশংসাও করা উচিত। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিলেন বলেই হয়তো ছয় মাস পর সবাই বিচার-বিশ্লেষণ করছে, সরকার যতটা এগোতে চেয়েছিল ততটা এগোতে পেরেছে কিনা। তার শেষ কথা, এ ধরনের সময়সীমার খুব একটা অর্থ নেই—প্রতিদিনই সরকারের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে হবে এবং প্রতিদিনই এক ধরনের জবাবদিহি থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে সরকারের ১৮০ দিনের চিত্রটি একরৈখিক নয়। এক পক্ষ দেখছে ভোটাধিকার ফেরা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল আর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মতো অর্জন; আরেক পক্ষ দেখছে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, মব সংস্কৃতি আর প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের মতো ব্যর্থতা। প্রতিশ্রুত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা বাস্তবে রূপ নিলো, আর আগামী দিনে সেই গতি কতটা ধরে রাখা যায়—সেটিই এখন নির্ধারণ করবে সরকারের পরবর্তী পথচলা।

Share this news as a Photo Card