লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ, রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান আন্দোলনকারীদের

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র রূপ নেয়। সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়—মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান। আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার সোমবার রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানান, নিহত ও নির্যাতিতদের বিচার না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে বলেই এই প্রতিবাদী কর্মসূচি। সঙ্গে যুক্ত করা হয় আন্দোলনের ৯ দফা দাবির কথাও। মধ্যরাত থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও অনেক তারকা এতে সাড়া দিয়ে প্রোফাইল ছবি বদলাতে শুরু করেন।
অন্যদিকে একই সময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার অংশ হিসেবে কালো ব্যাজ ধারণ এবং সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনের কথা বলা হয়। এই দুই বিপরীতমুখী কর্মসূচি সেদিনকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়—চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, বগুড়া, যশোর, নোয়াখালীসহ একাধিক স্থানে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া অবস্থানের মধ্যেও পল্টন, সেগুনবাগিচা, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০ এলাকায় জড়ো হন শিক্ষার্থীরা, যাদের ধাওয়া ও লাঠিচার্জে ছত্রভঙ্গ করা হয় এবং অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। রাজধানীতে ব্যাপকসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, র‍্যাবের হেলিকপ্টার টহল, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং একাধিক চেকপোস্ট বসানো হয়। তবে দশম দিনের মতো চলা কারফিউয়ের মধ্যেই অফিস-আদালত ও সড়কে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়।
এই সময়ে বিচার বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে। কোটা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রেখে খাওয়ানোর দৃশ্য প্রকাশ করাকে হাইকোর্ট জাতির সঙ্গে মশকরা বলে আখ্যা দেন। একই দিনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সমন্বয়কদের জোরপূর্বক বিবৃতি আদায়ের ঘটনাকে অনৈতিক ও গর্হিত অপরাধ বলে নিন্দা জানায়। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের মানববন্ধন থেকে গঠন করা হয় ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশন’, যার লক্ষ্য আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করা।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা প্রতিক্রিয়া আসে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি হিসেবে প্রকাশিত নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, দাবি করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। গণতন্ত্র মঞ্চ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তসহ ছয় দফা দাবি জানায়, যার মধ্যে ছিল কারফিউ প্রত্যাহার ও সেনা-বিজিবিকে ব্যারাকে ফেরানোর আহ্বান। রাতে গণভবনে ১৪ দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, যেখানে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে ঐকমত্য হয় বলে জানান ওবায়দুল কাদের।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক এই সময়কার মৃত্যুর ঘটনাবলিকে ‘জুলাই হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে আটকদের মুক্তি ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। ৭৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকও পৃথক বিবৃতিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্তের আহ্বান জানান।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

শিশুদের সঠিক গড়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

২৮ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ, রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান আন্দোলনকারীদের

আপডেট সময় ০৭:৩৩:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র রূপ নেয়। সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়—মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান। আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার সোমবার রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানান, নিহত ও নির্যাতিতদের বিচার না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে বলেই এই প্রতিবাদী কর্মসূচি। সঙ্গে যুক্ত করা হয় আন্দোলনের ৯ দফা দাবির কথাও। মধ্যরাত থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও অনেক তারকা এতে সাড়া দিয়ে প্রোফাইল ছবি বদলাতে শুরু করেন।
অন্যদিকে একই সময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার অংশ হিসেবে কালো ব্যাজ ধারণ এবং সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনের কথা বলা হয়। এই দুই বিপরীতমুখী কর্মসূচি সেদিনকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়—চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, বগুড়া, যশোর, নোয়াখালীসহ একাধিক স্থানে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া অবস্থানের মধ্যেও পল্টন, সেগুনবাগিচা, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০ এলাকায় জড়ো হন শিক্ষার্থীরা, যাদের ধাওয়া ও লাঠিচার্জে ছত্রভঙ্গ করা হয় এবং অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। রাজধানীতে ব্যাপকসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, র‍্যাবের হেলিকপ্টার টহল, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং একাধিক চেকপোস্ট বসানো হয়। তবে দশম দিনের মতো চলা কারফিউয়ের মধ্যেই অফিস-আদালত ও সড়কে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়।
এই সময়ে বিচার বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে। কোটা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রেখে খাওয়ানোর দৃশ্য প্রকাশ করাকে হাইকোর্ট জাতির সঙ্গে মশকরা বলে আখ্যা দেন। একই দিনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সমন্বয়কদের জোরপূর্বক বিবৃতি আদায়ের ঘটনাকে অনৈতিক ও গর্হিত অপরাধ বলে নিন্দা জানায়। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের মানববন্ধন থেকে গঠন করা হয় ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশন’, যার লক্ষ্য আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করা।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা প্রতিক্রিয়া আসে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি হিসেবে প্রকাশিত নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, দাবি করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। গণতন্ত্র মঞ্চ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তসহ ছয় দফা দাবি জানায়, যার মধ্যে ছিল কারফিউ প্রত্যাহার ও সেনা-বিজিবিকে ব্যারাকে ফেরানোর আহ্বান। রাতে গণভবনে ১৪ দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, যেখানে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে ঐকমত্য হয় বলে জানান ওবায়দুল কাদের।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক এই সময়কার মৃত্যুর ঘটনাবলিকে ‘জুলাই হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে আটকদের মুক্তি ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। ৭৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকও পৃথক বিবৃতিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্তের আহ্বান জানান।

Share this news as a Photo Card