শিরোনাম :
আসিফ মাহমুদের পর্তুগাল-সুইজারল্যান্ডসহ ৫ দেশে হাজার কোটি টাকা পাচার পাকিস্তান থেকে সরে ভারতের দিকে ঝুঁকছে চীন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা ইরাকের ড্রোন হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, বাড়ছে তেলের দাম শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না স্থানীয় নির্বাচনে: প্রতিমন্ত্রী স্ত্রীসহ ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যানের ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক দলীয় প্রতীকবিহীন স্বচ্ছ নির্বাচনের অঙ্গীকার সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর বার্সেলোনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত থাকছেন ‘মিশরের হালান্ড’ খ্যাত হামজা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ হাইকোর্টে আমিশা প্যাটেলের মুম্বাইয়ের বাড়িতে চুরি, গৃহকর্মী গ্রেফতার

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে উত্তেজনা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকে দেশে-বিদেশে বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছে একটিই প্রশ্ন—ডিসেম্বরে আসলে কী ঘটতে চলেছে? বিষয়টি এতটাই আলোচিত হয়ে উঠেছে যে, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বরই যেন হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিরোধী দলগুলোর ঘোষণা, যারাও ডিসেম্বরের মধ্যে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। ফলে একদিকে জল্পনা-কল্পনা, অন্যদিকে নানা গুজব—দুইয়ে মিলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। বর্ষা পেরিয়ে শরতে পা রাখা বাংলাদেশের আকাশে যেন এখন রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে দিন দিন। আসছে শীতের ভরা মৌসুমে রাজনীতির মাঠ কতটা ঘোলাটে হয়ে উঠবে, নাকি সেই কুয়াশা কাটিয়ে দেশ পাবে নতুন কোনো মোড়—তা নিয়েই এখন যাবতীয় জল্পনা।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার খবর যেমন আলোচনায়, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের ইস্যুও। একদিকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের একটি অংশ সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যেই ক্ষমতা ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। দুটি ঘটনাকে অনেকেই নিছক কাকতালীয় মনে করছেন না; বরং তাদের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে কোনো যোগসূত্র। কিছু রাজনৈতিক শক্তি ডিসেম্বরের মধ্যেই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের লক্ষ্যে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকে ফিরে তাকাচ্ছেন ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে, যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের একটি রাজনৈতিক সংযোগ দেখা গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা এখন সরাসরি জামায়াতের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন তুলছেন, পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোনো নতুন সমঝোতা হচ্ছে কি না। জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে বলছে, অতীতে যা হয়েছে তা সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেই হয়েছিল, আর বিএনপির সঙ্গেও তো তাদের জোট হয়েছে। এভাবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর বিবৃতির মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে তৈরি হচ্ছে নতুন উত্তেজনা।

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্পষ্ট করে বলছেন, শেখ হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে এবং দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। কেউ আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের বিধান দেশের আইনেই আছে এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে প্রত্যেকের নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার অনুপস্থিতিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী আপিলের নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় তার আপিলের সুযোগও এখন সীমিত বলে জানা যাচ্ছে। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার আর আপিল করার আইনি সুযোগ নেই। তার ভাষায়, প্রযুক্তিগতভাবে বিষয়টি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে তিনি দেশে ফিরলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ডই অপেক্ষা করছে, আর সরকার তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়।

এমন অবস্থার মধ্যেও শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদেরও দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি সত্যিই ফিরবেন, নাকি ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুরাহা মেলেনি। তিনি ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া পার হয়ে কীভাবে দেশে প্রবেশ করবেন, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন এই ইস্যু ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন ধোঁয়াশা।

জানা গেছে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছিল। এ কারণে দেশে ফিরতে হলে তার প্রয়োজন হবে একটি ট্রাভেল পাস, অথবা জোরপূর্বক প্রবেশের ব্যবস্থা। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা এখনো ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেননি। তার বর্তমানে কোনো বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হলে তাকে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতেই হবে; অন্যথায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। তবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরা তার অধিকার বলেও মনে করিয়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, আর পাসপোর্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনে ট্রাভেল পাসের আবেদন করার সুযোগ থেকে যায়।

ট্রাভেল পাস মূলত একটি সাময়িক ও একমুখী ভ্রমণ দলিল, যা পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া বা বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের শুধু দেশে ফেরার অনুমতি দেয়। সাধারণত এটি তিন মাসের জন্য বৈধ থাকে, এতে বিদেশি ভিসার প্রয়োজন হয় না এবং এটি দিয়ে অন্য কোনো দেশে যাওয়া যায় না। দেশে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশনে তা জমা দিতে হয় এবং পরে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়। তবে আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, সাজাপ্রাপ্ত বা পলাতক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষ রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত ছাড়া ট্রাভেল পাস ইস্যু করা কঠিন। ফলে ট্রাভেল পাস ছাড়া তিনি কীভাবে সীমান্ত পার হয়ে দেশে প্রবেশ করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এদিকে ভারত এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো সরাসরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করেনি। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না।

তিনি সত্যিই দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ একাধিক মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। সরকারি মহলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, আর কারাবন্দি অবস্থায় বা বিচারকালে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও হয়ে উঠবে সরকারের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাই তিনি যেভাবেই দেশে ফিরুন না কেন, প্রথমেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে। এরপর তিনি আইনজীবী নিয়োগ করে আপিল করতে চাইলে সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, তবে তিনি আদৌ ফিরবেন কি না বা আপিল করবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। তার ব্যাখ্যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আসামি নিজে আপিল করতে পারেন, আর যেহেতু শেখ হাসিনা এই সময়ের মধ্যে আপিল করেননি, তাই তার আর সাধারণ প্রক্রিয়ায় আপিলের সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, আইনের চোখে পলাতক হলেও শেখ হাসিনা ভারত সরকারের আশ্রয়ে জীবনযাপন করছেন বলে তাকে ফেরত চেয়ে ইতিমধ্যে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির অবশ্য বলছেন, শেখ হাসিনা চাইলে আপিলের উদ্যোগ নিতে পারেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা শুনানিতেই নির্ধারিত হবে। যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন একটি বিশেষ আইন এবং এতে নির্ধারিত সময়ের বাইরে আপিলের কোনো পৃথক বিধান নেই, তাই সময় পেরিয়ে যাওয়া আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা আপিল বিভাগের বিবেচনার বিষয়। অন্যদিকে ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের মতে, বিলম্বের যথাযথ কারণ দেখিয়ে আদালতে আবেদন করা হলে এবং তা আদালত গ্রহণ করলে আপিলের পথ খুলতে পারে, যেমনটি সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় অতীতে দেখা গেছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিদেশে পলাতক থাকার যুক্তি দেখিয়ে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আদালতই।

রাজনৈতিক উত্তাপের আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন। গণভোট বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য দেশজুড়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে একটি লংমার্চ হয়েছে, আর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে আরেকটি লংমার্চের কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। জোটের নেতারা তাদের আগের ছয় দফা দাবিকে পরিবর্তন করে একদফা বা সরকার পতনের দাবিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পতনের আন্দোলন সফল করা হবে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক সভায় বলেছেন, মানুষের মুখে মুখে এখন এই কথাই ঘুরছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে।

সরকারের ছয় মাসের মাথায় বিরোধী জোটের এমন কর্মসূচি ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বিরোধী দলের লংমার্চসহ কর্মসূচিকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী কালচার’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালেও একই পক্ষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছিল। তার ভাষায়, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরা আর বিরোধী দলের আন্দোলনের ঘোষণার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তারা কখনো ডিসেম্বরে সরকার পতনের কথা বলেননি এবং এমন দাবি প্রমাণসাপেক্ষ। তিনি আরও জানান, ১৯৮৬ সালে তারা কারও সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট করেননি, বরং ১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে থেকে সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছিলেন। তার ব্যাখ্যায়, ১৯৮৬ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন দলের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থাকলেও লক্ষ্য ছিল একটাই—এরশাদ সরকারের পতন। রাজনৈতিক আন্দোলনে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বা সমন্বয় থাকাটা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি বিএনপির সঙ্গেও ছিল। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, বিষয়টি হয়তো আওয়ামী লীগের নিজস্ব কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে দলকে টিকিয়ে রাখা ও নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা হতে পারে। তবে বাস্তবে কী ঘটবে তা সময়ই বলে দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, ট্রাভেল পাস ও আইনি জটিলতা এবং বিরোধী জোটের একদফা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলে আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার আভাস দিচ্ছে। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, শেখ হাসিনার প্রকৃত প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা, ভারতের সিদ্ধান্ত এবং বিরোধী জোটের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ—এসব বিষয়ে এখনো অনেক কিছুই অনিশ্চিত এবং যাচাই-সাপেক্ষ, যা আগামী দিনে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই স্পষ্ট হবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

আসিফ মাহমুদের পর্তুগাল-সুইজারল্যান্ডসহ ৫ দেশে হাজার কোটি টাকা পাচার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

আমিশা প্যাটেলের মুম্বাইয়ের বাড়িতে চুরি, গৃহকর্মী গ্রেফতার

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে উত্তেজনা

আপডেট সময় ০১:২২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকে দেশে-বিদেশে বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছে একটিই প্রশ্ন—ডিসেম্বরে আসলে কী ঘটতে চলেছে? বিষয়টি এতটাই আলোচিত হয়ে উঠেছে যে, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বরই যেন হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিরোধী দলগুলোর ঘোষণা, যারাও ডিসেম্বরের মধ্যে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। ফলে একদিকে জল্পনা-কল্পনা, অন্যদিকে নানা গুজব—দুইয়ে মিলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। বর্ষা পেরিয়ে শরতে পা রাখা বাংলাদেশের আকাশে যেন এখন রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে দিন দিন। আসছে শীতের ভরা মৌসুমে রাজনীতির মাঠ কতটা ঘোলাটে হয়ে উঠবে, নাকি সেই কুয়াশা কাটিয়ে দেশ পাবে নতুন কোনো মোড়—তা নিয়েই এখন যাবতীয় জল্পনা।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার খবর যেমন আলোচনায়, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের ইস্যুও। একদিকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের একটি অংশ সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যেই ক্ষমতা ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। দুটি ঘটনাকে অনেকেই নিছক কাকতালীয় মনে করছেন না; বরং তাদের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে কোনো যোগসূত্র। কিছু রাজনৈতিক শক্তি ডিসেম্বরের মধ্যেই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের লক্ষ্যে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকে ফিরে তাকাচ্ছেন ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে, যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের একটি রাজনৈতিক সংযোগ দেখা গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা এখন সরাসরি জামায়াতের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন তুলছেন, পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোনো নতুন সমঝোতা হচ্ছে কি না। জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে বলছে, অতীতে যা হয়েছে তা সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেই হয়েছিল, আর বিএনপির সঙ্গেও তো তাদের জোট হয়েছে। এভাবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর বিবৃতির মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে তৈরি হচ্ছে নতুন উত্তেজনা।

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্পষ্ট করে বলছেন, শেখ হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে এবং দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। কেউ আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের বিধান দেশের আইনেই আছে এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে প্রত্যেকের নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার অনুপস্থিতিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী আপিলের নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় তার আপিলের সুযোগও এখন সীমিত বলে জানা যাচ্ছে। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার আর আপিল করার আইনি সুযোগ নেই। তার ভাষায়, প্রযুক্তিগতভাবে বিষয়টি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে তিনি দেশে ফিরলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ডই অপেক্ষা করছে, আর সরকার তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়।

এমন অবস্থার মধ্যেও শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদেরও দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি সত্যিই ফিরবেন, নাকি ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুরাহা মেলেনি। তিনি ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া পার হয়ে কীভাবে দেশে প্রবেশ করবেন, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন এই ইস্যু ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন ধোঁয়াশা।

জানা গেছে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছিল। এ কারণে দেশে ফিরতে হলে তার প্রয়োজন হবে একটি ট্রাভেল পাস, অথবা জোরপূর্বক প্রবেশের ব্যবস্থা। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা এখনো ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেননি। তার বর্তমানে কোনো বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হলে তাকে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতেই হবে; অন্যথায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। তবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরা তার অধিকার বলেও মনে করিয়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, আর পাসপোর্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনে ট্রাভেল পাসের আবেদন করার সুযোগ থেকে যায়।

ট্রাভেল পাস মূলত একটি সাময়িক ও একমুখী ভ্রমণ দলিল, যা পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া বা বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের শুধু দেশে ফেরার অনুমতি দেয়। সাধারণত এটি তিন মাসের জন্য বৈধ থাকে, এতে বিদেশি ভিসার প্রয়োজন হয় না এবং এটি দিয়ে অন্য কোনো দেশে যাওয়া যায় না। দেশে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশনে তা জমা দিতে হয় এবং পরে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়। তবে আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, সাজাপ্রাপ্ত বা পলাতক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষ রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত ছাড়া ট্রাভেল পাস ইস্যু করা কঠিন। ফলে ট্রাভেল পাস ছাড়া তিনি কীভাবে সীমান্ত পার হয়ে দেশে প্রবেশ করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এদিকে ভারত এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো সরাসরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করেনি। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না।

তিনি সত্যিই দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ একাধিক মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। সরকারি মহলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, আর কারাবন্দি অবস্থায় বা বিচারকালে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও হয়ে উঠবে সরকারের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাই তিনি যেভাবেই দেশে ফিরুন না কেন, প্রথমেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে। এরপর তিনি আইনজীবী নিয়োগ করে আপিল করতে চাইলে সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, তবে তিনি আদৌ ফিরবেন কি না বা আপিল করবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। তার ব্যাখ্যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আসামি নিজে আপিল করতে পারেন, আর যেহেতু শেখ হাসিনা এই সময়ের মধ্যে আপিল করেননি, তাই তার আর সাধারণ প্রক্রিয়ায় আপিলের সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, আইনের চোখে পলাতক হলেও শেখ হাসিনা ভারত সরকারের আশ্রয়ে জীবনযাপন করছেন বলে তাকে ফেরত চেয়ে ইতিমধ্যে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির অবশ্য বলছেন, শেখ হাসিনা চাইলে আপিলের উদ্যোগ নিতে পারেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা শুনানিতেই নির্ধারিত হবে। যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন একটি বিশেষ আইন এবং এতে নির্ধারিত সময়ের বাইরে আপিলের কোনো পৃথক বিধান নেই, তাই সময় পেরিয়ে যাওয়া আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা আপিল বিভাগের বিবেচনার বিষয়। অন্যদিকে ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের মতে, বিলম্বের যথাযথ কারণ দেখিয়ে আদালতে আবেদন করা হলে এবং তা আদালত গ্রহণ করলে আপিলের পথ খুলতে পারে, যেমনটি সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় অতীতে দেখা গেছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিদেশে পলাতক থাকার যুক্তি দেখিয়ে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আদালতই।

রাজনৈতিক উত্তাপের আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন। গণভোট বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য দেশজুড়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে একটি লংমার্চ হয়েছে, আর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে আরেকটি লংমার্চের কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। জোটের নেতারা তাদের আগের ছয় দফা দাবিকে পরিবর্তন করে একদফা বা সরকার পতনের দাবিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পতনের আন্দোলন সফল করা হবে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক সভায় বলেছেন, মানুষের মুখে মুখে এখন এই কথাই ঘুরছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে।

সরকারের ছয় মাসের মাথায় বিরোধী জোটের এমন কর্মসূচি ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বিরোধী দলের লংমার্চসহ কর্মসূচিকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী কালচার’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালেও একই পক্ষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছিল। তার ভাষায়, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরা আর বিরোধী দলের আন্দোলনের ঘোষণার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তারা কখনো ডিসেম্বরে সরকার পতনের কথা বলেননি এবং এমন দাবি প্রমাণসাপেক্ষ। তিনি আরও জানান, ১৯৮৬ সালে তারা কারও সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট করেননি, বরং ১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে থেকে সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছিলেন। তার ব্যাখ্যায়, ১৯৮৬ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন দলের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থাকলেও লক্ষ্য ছিল একটাই—এরশাদ সরকারের পতন। রাজনৈতিক আন্দোলনে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বা সমন্বয় থাকাটা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি বিএনপির সঙ্গেও ছিল। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, বিষয়টি হয়তো আওয়ামী লীগের নিজস্ব কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে দলকে টিকিয়ে রাখা ও নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা হতে পারে। তবে বাস্তবে কী ঘটবে তা সময়ই বলে দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, ট্রাভেল পাস ও আইনি জটিলতা এবং বিরোধী জোটের একদফা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলে আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার আভাস দিচ্ছে। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, শেখ হাসিনার প্রকৃত প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা, ভারতের সিদ্ধান্ত এবং বিরোধী জোটের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ—এসব বিষয়ে এখনো অনেক কিছুই অনিশ্চিত এবং যাচাই-সাপেক্ষ, যা আগামী দিনে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই স্পষ্ট হবে।

Share this news as a Photo Card