সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একাধিক ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের জেরে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বুধবার এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) জানানো হয় আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে, পৃথক দুটি চিঠির মাধ্যমে।
চিঠিতে জামায়াত জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে দলীয়ভাবে একটি সাংগঠনিক তদন্ত পরিচালনা করা হয়। সেই তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও জানানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, গত মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমকে জানান, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদের স্পিকার—উভয়ের কাছেই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তবে চিঠি পাঠাতে বাড়তি একদিন সময় লাগার পেছনে কিছু কারণ উঠে এসেছে। জামায়াতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠক শেষ হতে হতে অফিস সময় পার হয়ে যাওয়ায় সেদিন আর চিঠি পাঠানো সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি অতীতে ভিন্ন দুটি সরকারের আমলে সংসদ সদস্য পদ সংক্রান্ত এমন দুটি ঘটনায় আগে স্পিকারকে অবহিত করার নজির থাকায়, এবার আগে কাকে চিঠি দেওয়া হবে—স্পিকার নাকি সিইসিকে—তা নিয়ে দলের মধ্যে পর্যালোচনা চলে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, দুই প্রতিষ্ঠানেই একযোগে চিঠি পাঠানো হবে।
৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল এবারসহ মোট তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সাতক্ষীরা–৪ আসন থেকে সংসদে যান। দলের সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্যও ছিলেন তিনি।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই জামায়াতের খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন সাতক্ষীরা–২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আবদুল খালেকও। তদন্তের অংশ হিসেবে গাজী নজরুল নিজে কমিটির কাছে বক্তব্য দেন, পাশাপাশি তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও রেকর্ড করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে জমা দেওয়া হয়, যা নিয়ে আলোচনার পরই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য জানান, তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে গাজী নজরুল বিয়ের আগেই ওই নারীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন, যাকে দলের দৃষ্টিতে ‘পর্দা লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে সংগঠনের ভাবমূর্তিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা শুধু সদস্যপদ বাতিলের মধ্য দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করেছে দলটি। এ ছাড়া জামায়াতের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর নিকটাত্মীয়, এবং ঢাকায় এলে তিনি মাঝেমধ্যে সেই আত্মীয়ের বাসাতেই উঠতেন।
উল্লেখ্য, সোমবার রাতে গাজী নজরুলের একাধিক ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। শুরুতে দলের অনেক নেতা-কর্মী ভিডিওগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করলেও পরদিন গাজী নজরুল নিজেই ফেসবুক পোস্টে জানান, ভিডিওতে থাকা নারী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তাঁদের পারিবারিক বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। জামায়াত ও গাজী নজরুলের পরিবারের দাবি, ভিডিওগুলো বিয়ের পরের এবং তা প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতেই ধারণ করা। তবে দলের একাংশের ধারণা, নৈতিক স্খলনের পাশাপাশি তিনি একটি ব্ল্যাকমেল চক্রেরও শিকার হয়েছেন।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















