একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে রিকশায় চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন ৪২ বছর বয়সী সোহেলি ইসলাম। কিন্তু চিরচেনা রাজধানীতে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের নির্মম থাবা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। চলন্ত রিকশায় ছিনতাইকারীর ব্যাগ ধরে টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই কর্মজীবী নারী।
গত রোববার (৭ জুন) ভোর সোয়া ছয়টার দিকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সোহেলি ইসলাম এসকেএফ ওষুধ কোম্পানিতে ‘মেডিক্যাল সার্ভিস অফিসার’ পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি ঢাকার ধানমন্ডির গ্রীন রোড সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় মেয়েকে নিয়ে থাকতেন।
যেভাবে ঘটলো সেই নির্মম ঘটনা
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের দেশের বাড়ি থেকে গত শনিবার রাতে মেয়ে সুমাইয়া আলমকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে বাসে ওঠেন সোহেলি। রোববার ভোর পাঁচটায় বাস গাবতলী পৌঁছালে নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা কাউন্টারে প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেন। সকাল ছয়টার দিকে একটি রিকশা নিয়ে ধানমন্ডির বাসার দিকে রওনা হন মা ও মেয়ে।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেট পার হওয়ার সময় পেছন থেকে হেলমেট পরা দুই আরোহী একটি মোটরসাইকেলে করে তাঁদের রিকশার পাশে আসে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি আচমকা সোহেলির হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগটি ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। গতিশীল রিকশায় আকস্মিক এই টানে ভারসাম্য হারিয়ে শক্ত পিচঢালা রাস্তায় ছিটকে পড়েন সোহেলি।
তাঁর স্বজনরা জানান, রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ডান হাতটি ভেঙে যায় এবং কান দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
‘সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসছিল না’
সোহেলির বোনের স্বামী তরিকুল ইসলাম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার পর সোহেলির মাথার পেছনের অংশ ফেটে যায়। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের মধ্যে তাঁর মেয়ে অনেকের কাছেই সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমে কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে রিকশাচালক এবং স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় তাঁকে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়।”
অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তরিকুল ইসলাম বলেন, “ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি আর কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন।”
গতকাল সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বিকেলে পাবনার ঈশ্বরদীতে নানা বাড়িতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই ঘটনায় এখনো থানায় কোনো মামলা করা হয়নি। পরিবার জানিয়েছে, ধাক্কা সামলে ওঠার পর তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
এক সংগ্রামী জীবনের অবসান
প্রায় ১৫ বছর আগে বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে একমাত্র মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে একা লড়াই করছিলেন সোহেলি। বছর দুয়েক আগে বাবা এবং তার মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মাকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এবার একমাত্র মেয়েকে সম্পূর্ণ একা করে চলে গেলেন তিনি।
মায়ের এমন আকস্মিক ও নির্মম মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন মেয়ে সুমাইয়া আলম, যিনি বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















