রাত পোহালেই আলজেরিয়া বধের মিশন: বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাস কী বলছে?
ঢাকা: ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় দল আর্জেন্টিনা। মাঠে আলবিসেলেস্তেদের উপস্থিতি মানেই কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া। বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ ঘিরেই তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা, যার শুরুটা হয় টুর্নামেন্টের একেবারে প্রথম ম্যাচ থেকে।
রাত পোহালেই ফুটবলপ্রেমীরা মেতে উঠবেন এক নতুন উন্মাদনায়। এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচটি ঘিরে ইতিমধ্যেই ভক্তদের মাঝে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি আর্জেন্টিনার ১৯তম আসর। এর আগে খেলা ১৮টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে কেমন ছিল আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স? পরিসংখ্যান বলছে, সবমিলিয়ে ১৮টি উদ্বোধনী ম্যাচের ১১টিতেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা, হেরেছে ৬টিতে এবং ড্র হয়েছে মাত্র ১টি ম্যাচ। এই ম্যাচগুলোতে তারা গোল করেছে ২৭টি, আর হজম করেছে ১৯টি।
আলজেরিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে, অতীতে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার সেই চড়াই-উতরাইয়ের ইতিহাস দেখে নেওয়া যাক।
শুরুর অধ্যায়: ১৯৩০ থেকে ১৯৬৬
উরুগুয়ে ১৯৩০: প্রথম ম্যাচেই জয়
১৯৩০ সালের ১৫ জুলাই আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ওই ম্যাচে লুইস মন্তির ৮১ মিনিটের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। মজার ব্যাপার হলো, পরের বিশ্বকাপে এই মন্তিই ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে ফাইনালে ৪–২ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা।
ইতালি ১৯৩৪: প্রথম ম্যাচেই বিদায়
নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে গিয়ে প্রথম ম্যাচে হারের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। সুইডেনের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় তারা। আলবিসেলেস্তেদের জন্য প্রথম ম্যাচটিই শেষ ম্যাচ হয়ে গিয়েছিল সেবার, কারণ টুর্নামেন্টটি সরাসরি নকআউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সুইডেন ১৯৫৮: দীর্ঘ বিরতির পর তিক্ত প্রত্যাবর্তন
টানা তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এই আসর দিয়ে আবার বিশ্বমঞ্চে ফেরে আর্জেন্টিনা। তবে ফেরাটা সুখকর হয়নি। ওরেস্তে করবাত্তার গোলে শুরুতে এগিয়ে গেলেও হেলমুট রানের জোড়া গোল ও উভে জিলারের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে পশ্চিম জার্মানি। পরে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৬–১ গোলের বিশাল হারে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়তে হয় আর্জেন্টনাকো।
চিলি ১৯৬২ ও ইংল্যান্ড ১৯৬৬: জয়ের ধারা
১৯৬২ সালে রানকাগুয়ায় হেক্টর ফ্যাকুন্দোর একমাত্র গোলে বুলগেরিয়াকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে জয় দিয়েই বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। তবে পরের রাউন্ডে যেতে ব্যর্থ হয় তারা। ১৯৬৬ সালে লুইস আরতিমের জোড়া গোলে স্পেনের বিপক্ষে ২–১ ব্যবধানে জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করে আর্জেন্টিনা। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় তারা।
ম্যারাডোনা যুগ ও শিরোপার স্বাদ: ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৪
জার্মানি ১৯৭৪: হারের বৃত্তে
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব পার করতে পারেনি আর্জেন্টিনা, যা তাদের ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের শুরুটাও তাদের জন্য হয় হার দিয়ে। পোল্যান্ডের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় তারা এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়।
আর্জেন্টিনা ১৯৭৮: প্রথম শিরোপার পথে কষ্টার্জিত জয়
নিজেদের মাটিতে আয়োজিত একমাত্র বিশ্বকাপে বেশ কষ্টার্জিত জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। ড্যানিয়েল বার্টোনির শেষ মুহূর্তের গোলে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২–১ ব্যবধানে জয় পায় তারা। এই আসরের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩–১ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি জেতে আলবিসেলেস্তেরা।
স্পেন ১৯৮২ ও মেক্সিকো ১৯৮৬: ধাক্কা এবং ম্যারাডোনা জাদু
১৯৮২ সালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে এসে প্রথম ম্যাচেই বেলজিয়ামের কাছে ১-০ ব্যবধানে ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। তবে ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। হোর্হে ভালদানোর দুটি ও অস্কার রুগারির গোলে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩–১ ব্যবধানে জয় দিয়ে শুরু করে এবং ফাইনালে জার্মানিকে ৩–২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।
ইতালি ১৯৯০ ও যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪: ক্যামেরুন অঘটন ও ম্যারাডোনার অন্ধকার অধ্যায়
১৯৯০ সালে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমে প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে ১–০ ব্যবধানে বড় অঘটনের শিকার হয় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। অবশ্য সেবার তারা ফাইনাল খেলে রানার্স-আপ হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে গ্রিসকে ৪–০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তবে এই বিশ্বকাপের মাঝপথেই ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে ম্যারাডোনা বহিষ্কার হলে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বিদায় নেয় দল।
বাতিস্তুতা ও মেসি যুগ: ১৯৯৮ থেকে ২০১৮
ফ্রান্স ১৯৯৮ ও কোরিয়া–জাপান ২০০২: বাতিস্তুতার একক আধিপত্য
১৯৯৮ সালে প্রথমবার অংশ নেওয়া জাপানের বিপক্ষে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে আর্জেন্টিনা। ২০০২ সালেও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে বাতিস্তুতার একমাত্র গোলেই ১–০ ব্যবধানে জয় পায় তারা। তবে ২০০২ সালে ফেবারিট হিসেবে এসেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল মার্সেলো বিয়েলসার দলকে।
জার্মানি ২০০৬ ও দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০: নবাগতদের বিপক্ষে পরীক্ষা
২০০৬ সালে হার্নান ক্রেসপো ও হাভিয়ের স্যাভিয়োলার গোলে নবাগত আইভরি কোস্টকে ২–১ ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালে জোহানেসবার্গে নাইজেরিয়ান গোলরক্ষক দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেও গ্যাব্রিয়েল হাইনসের দুর্দান্ত হেডে ১–০ ব্যবধানে জয় পায় ম্যারাডোনার শিষ্যরা। তবে দুই আসরেই কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের।
ব্রাজিল ২০১৪ ও রাশিয়া ২০১৮: মেসির উত্থান ও পেনাল্টি মিসের হতাশা
২০১৪ সালে লিওনেল মেসির দর্শনীয় গোল ও একটি আত্মঘাতী গোলে নবাগত বসনিয়াকে ২–১ ব্যবধানে হারিয়ে শুভসূচনা করে আর্জেন্টিনা। সেবার তারা ফাইনালে উঠে জার্মানির কাছে হারে। তবে ২০১৮ সালে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে সার্জিও আগুয়েরো গোল করলেও মেসির পেনাল্টি মিসের কারণে ম্যাচটি ১–১ ড্র হয়। শেষ পর্যন্ত শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা।
কাতার ২০২২: মহাকাব্যিক সমাপ্তি
আর্জেন্টিনার সর্বশেষ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের ধাক্কার স্মৃতিটা ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখনো বেশ তরতাজা। লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে ম্যাচের শুরুটা সহজ মনে হলেও দ্বিতীয়ার্ধে সালেহ আল–শেহরি ও সালেম আল–দাওসারির চমৎকার দুটি গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় সৌদি আরব। এই হারে আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
তবে শুরুর সেই ধাক্কা যে আর্জেন্টিনার জন্য শাঁখে ফুঁ দেওয়ার মতো কাজ করেছিল, তা পরের ইতিহাসই বলে দেয়। সমস্ত বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন লিওনেল মেসি।
এবার সামনে আলজেরিয়া
অতীতের পরিসংখ্যান এবং ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে গোল করতে পারেনি এমন ঘটনা ঘটেছে কেবল দুইবার (১৯৮২ ও ১৯৯০)। সাধারণত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই টুর্নামেন্ট শুরু করতে পছন্দ করে আকাশী-সাদারা।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনা দল মানসিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে। তবে ২০২২ সালের সৌদি আরব ম্যাচের শিক্ষা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি কোচ ও খেলোয়াড়েরা। বিশ্বমঞ্চে কোনো প্রতিপক্ষকেই যে হালকাভাবে নেওয়া যায় না, সেই মন্ত্র নিয়েই আজ সকালে মাঠে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। এখন দেখার বিষয়, আলজেরিয়ার বিপক্ষে কেমন শুরু করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















