ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
২২ জুন ২০২৬
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় সাড়ে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার দায়ে আবু তাহের (৩৩) নামের এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আজ সোমবার (২২ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঝিনাইদহ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. ছালেহউজ্জামান এই ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় ঘোষণা করেন।
আইনি ইতিহাসে নজিরবিহীন দ্রুততায়, মাত্র ৫টি কর্মদিবসের মধ্যে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে রায় ঘোষণা করা হলো। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবু তাহের আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও লাশ গুমের চেষ্টার অপরাধে আসামিকে আরও ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; যা অনাদায়ে তাকে আরও ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
প্রলোভন, নৃশংসতা ও মরদেহ গুমের চেষ্টা
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। প্রতিবেশী আবু তাহের চিপস ও জুস কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাড়ে চার বছরের ওই শিশুটিকে নিজের ঘরে ডেকে নেন। সেখানে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি চিৎকার করতে গেলে আবু তাহের নিজের লুঙ্গি দিয়ে তার মুখ ও নাক চেপে ধরেন। এতে শ্বাসরোধে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ ধামাচাপা দিতে ওই রাতেই শিশুটির মরদেহ একটি বস্তায় ভরে পাশের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সেপটিক ট্যাংকের ভেতর লুকিয়ে রাখেন আবু তাহের।
দ্রুত গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি
ঘটনার পরপরই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান আবু তাহের। তবে পুলিশি তৎপরতায় পার পাননি তিনি। ঘটনার দিন রাতেই কুষ্টিয়া শহরের একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবু তাহের পুলিশের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। পেশায় আবু তাহের একটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি (সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
মাত্র ৫ কর্মদিবসে যেভাবে এলো রায়
আইনজীবীরা বলছেন, দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার ঘটনা বেশ বিরল। আদালত সূত্র জানায়:
- ২৬ মে ২০২৬: মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন।
- ১৭ জুন ২০২৬: আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
- পরবর্তী কর্মদিবসগুলোয়: অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আইনি শুনানি সম্পন্ন করা হয়।
- ২১ জুন ২০২৬ (রোববার): রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়।
- ২২ জুন ২০২৬ (সোমবার): অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ৫ম কর্মদিবসে আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করলেন।
”আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি” — স্বজন ও আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
এই রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিহত শিশুটির বাবা গণমাধ্যমকে বলেন, “আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। আমাদের বুক খালি হয়েছে, কিন্তু অপরাধী তার শাস্তি পেয়েছে। এখন আমাদের একমাত্র দাবি, এই রায় যেন উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে এবং দ্রুত কার্যকর করা হয়।”
রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আকিদুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড ছিল। বিজ্ঞ বিচারক যে রায় ঘোষণা করেছেন, তাতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই রায় অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা।”
তবে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম জোয়ার্দার রায়ের পর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















