ঢাকা
একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর সবসময়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ কৌতূহল ও গুরুত্বের জন্ম দেয়। এই সফর কেবল প্রটোকল বা সৌজন্য বিনিময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভূরাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া এবং এর পরপরই চীন সফরের সূচি কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, প্রথাগত ধারাবাহিকতায় প্রথম সফরটি হয়তো ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের মতো কোনো পরাশক্তিকে দিয়ে শুরু হবে। কিন্তু সেই চেনা পথ না হেঁটে কুয়ালালামপুরকে প্রথম গন্তব্য নির্ধারণের পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
ইতিহাসের আয়নায় প্রথম বিদেশ সফর
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রথম বিদেশ সফর সবসময়ই একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করেছে।
- জিয়াউর রহমানের সময়কাল: ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান তাঁর প্রথম সরকারি সফরে যান চীন ও ইরানে। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর ছিল ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে, প্রতিবেশী ভারতে। এর পরপরই তিনি পাকিস্তান সফরে যান, যা তৎকালীন যুদ্ধোত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
- বেগম খালেদা জিয়ার সময়কাল: ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিক সফর ছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে। তবে তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর ছিল ভারতে, যেখানে তিনি সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের বার্তা দিয়েছিলেন।
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বিদেশ সফর সবসময়ই একটি সরকারের দূরগামী কূটনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।
প্রথম গন্তব্য কেন মালয়েশিয়া?
কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি না হওয়া সত্ত্বেও মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি প্রতীকী এবং বাস্তববাদী—উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
১. অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের সমীকরণ
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী কর্মী কর্মরত আছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। নতুন সরকারের জন্য এই শ্রমবাজারের সংকট দূর করা এবং এর পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। ফলে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কুয়ালালামপুরের পারদানা পুত্রা ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বৈঠক সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত।
২. উন্নয়নের রোল মডেল
মালয়েশিয়া একটি সফল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, যা অত্যন্ত অল্প সময়ে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজেদের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের যে চ্যালেঞ্জ এখন বাংলাদেশের সামনে, তা মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও দক্ষ জনশক্তি গড়ার কৌশল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
”প্রথম সফরে মালয়েশিয়ার মতো দেশকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার সম্ভবত এই বার্তাই দিতে চেয়েছে যে, তাদের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল ভূরাজনীতি নয়, বরং অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণ।”
বেইজিং সফর: কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন মাত্রা
মালয়েশিয়া সফরের ঠিক পরপরই চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্তটি ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে।
চীন টানা দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শিল্প খাতে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ ও ভূমিকা দৃশ্যমান। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ বজায় রাখছে ঢাকা। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামেরও অন্যতম প্রধান উৎস।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির বাজারে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের জন্য অপরিহার্য। ফলে এই সফরকে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বহুমাত্রিক কূটনীতি ও ভারসাম্যের রাজনীতি
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়, বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে, তখন বাংলাদেশের মতো একটি মধ্যম শক্তির দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঢাকাকে একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। কোনো একটি পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া জাতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, মালয়েশিয়া ও চীন সফর একসঙ্গে একটি নিখুঁত ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে:
- একদিকে, মুসলিম বিশ্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (আসিয়ান অঞ্চল) সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার আঞ্চলিক বার্তা।
- অন্যদিকে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তির সঙ্গে বাস্তববাদী ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়াস।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি নতুন কিছু নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। বর্তমান বিশ্বেও ভিয়েতনামের ‘বাঁশ কূটনীতি’ (Bamboo Diplomacy), ইন্দোনেশিয়া কিংবা স্বয়ং মালয়েশিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ হাসিল করছে। বাংলাদেশও এখন সেই বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতির পথেই হাঁটছে।
আসল চ্যালেঞ্জ যেখানে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই জোড়া সফর শুরুটা দারুণ এবং বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিলেও, এর আসল সাফল্য মূল্যায়িত হবে ভবিষ্যতে।
সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে, শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে কতটা স্বচ্ছতা আনা যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যাচ্ছে তার ওপর। সর্বোপরি, পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে এই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে—তা-ই হবে আগামী দিনে এই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
যদি এই ভারসাম্য সফলভাবে রক্ষা করা যায়, তবে এই সফরটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















