শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই একটু থমকে দাঁড়িয়েছেন। কেউবা গালে হাত দিয়ে ভাবছেন—যেখানে চোখ জুড়ানো সীমাহীন জলরাশি আর দিগন্তজোড়া ঢেউয়ের মেলা, সেই অতলান্তিক বা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মাত্র এক বালতি পানি তুলে নিলে কি আসলেই কোনো তফাত ঘটে? সমুদ্রের পানি কি বিন্দুমাত্র কমে?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ যেন এক মহাসমুদ্রে এক ফোঁটা শিশিরবিন্দুর মতো। কিন্তু বিজ্ঞান ও গণিতের নিখুঁত হিসাব আমাদের এক অদ্ভুত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, সমুদ্র থেকে এক বালতি পানি সরালে প্রকৃতির বুকে আসলেই কী ঘটে।
উপচে পড়া গ্লাস এবং বাথটাবের সহজ পাঠ
পুরো বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য প্রথমে ঘরের ভেতরের একটি সহজ পরীক্ষা কল্পনা করা যাক। ধরুন, আপনি একটি কাচের গ্লাসে একদম কানায় কানায় উপচে পড়ার মতো পানি ভরলেন। এবার একটি ছোট চামচ দিয়ে খুব সাবধানে সেখান থেকে এক চা-চামচ পানি তুলে নিলেন। কী দেখতে পাবেন?
নিশ্চিতভাবেই গ্লাসের পানির স্তর আগের চেয়ে সামান্য নিচে নেমে যাবে। যদিও এই পরিবর্তন এতটাই সূক্ষ্ম যে, খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে তা খালি চোখে ধরা পড়বে না।
এখন পরীক্ষাটির পরিধি আরেকটু বাড়ানো যাক। একটি বড় বাথটাব সম্পূর্ণ পানিপূর্ণ করুন এবং সেখান থেকে সমপরিমাণ অর্থাৎ এক চামচ পানি তুলে নিন। এবার কিন্তু বাথটাবের পানির স্তরে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আপনার চোখেই পড়বে না। গ্লাসের চেয়ে বাথটাব বড় হওয়ায় পানির স্তর কমে যাওয়ার অনুপাতটি আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।
ঠিক একই নিয়ম খাটে আমাদের চেনা এই পৃথিবীর বিশাল ও বিস্তীর্ণ মহাসাগরগুলোর ক্ষেত্রেও। সমুদ্র থেকে যখন আপনি এক বালতি পানি তুলে নেন, তখন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক নিয়মে সমুদ্রের পানি ঠিকই কমে। কিন্তু সমুদ্রের বিশালতার তুলনায় সেই কমে যাওয়াটা এতই নগণ্য যে, মানব ইন্দ্রিয় দিয়ে তা অনুভব করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সমুদ্রের বিশালতা: কত বালতি পানি আছে পৃথিবীতে?
সমুদ্র কতটা বিশাল, তা আমরা মুখে বললেও সংখ্যার হিসাবে তা কল্পনা করাও কঠিন। চলুন একটু হিসাব কষে দেখা যাক।
ধরে নেওয়া যাক, আপনার হাতের বালতিটিতে ১০ লিটার পানি ধরে। এবার যদি প্রশ্ন করা হয়—পৃথিবীর সব সমুদ্রের সমস্ত পানি যদি এই ১০ লিটারের বালতি দিয়ে মেপে শেষ করতে হয়, তবে কতটি বালতির প্রয়োজন হবে?
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে জলভাগের পরিমাণ প্রায় ১৩৭ কোটি কিউবিক কিলোমিটার। এই বিশাল সংখ্যার সমস্ত পানিকে যদি ১০ লিটারের বালতিতে রূপান্তর করা হয়, তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন সংখ্যক বালতি! সহজ বাংলায় বলতে গেলে, ১৩৭-এর পিঠে আরও আঠারোটি শূন্য বসালে যে অতিদানবীয় সংখ্যাটি তৈরি হয়, ঠিক তত বালতি পানি লুকিয়ে আছে আমাদের এই চেনা পৃথিবীতে।
এই সংখ্যাটির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়, কেন এক বালতি পানির হারিয়ে যাওয়াটা সমুদ্রের কাছে কোনো বিষয়ই নয়।
দশমিকের পরের অন্তহীন শূন্য এবং একটি পরমাণুর গল্প
এবার আসা যাক আসল গাণিতিক হিসাবে। কোনো সমুদ্র থেকে যদি মাত্র এক বালতি (১০ লিটার) পানি তুলে নেওয়া হয়, তবে গাণিতিকভাবে সমুদ্রের পানির স্তর ঠিক কতটা নিচে নামবে?
গবেষক ও গণিতবিদদের নিখুঁত সূত্রে দেখা গেছে, এক বালতি পানি তুলে নিলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা পানির স্তর কমবে প্রায় ০.০০০০০০০০০০২৭৭ মিলিমিটার।
মিলিমিটার পরিমাপটি আমাদের স্কেলের সবচেয়ে ছোট ঘর, যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই। কিন্তু এই সংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, দশমিকের পর ১০টি শূন্যের পর এসেছে ২৭৭। এই পরিমাপটি ঠিক কতটা ছোট, তা সাধারণ মানুষের কল্পনা পার হয়ে যায়।
বিজ্ঞানের ভাষায়, একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হাইড্রোজেন পরমাণুর ব্যাস বা আকার হলো প্রায় ০.১ ন্যানোমিটার (অর্থাৎ ০.০০MDA০০০১ মিলিমিটার)। এর অর্থ হলো, সমুদ্র থেকে এক বালতি পানি তুলে নিলে পানির স্তর যতটুকু কমে, তা একটি অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর আকারের চেয়েও বহুগুণ ছোট!
বিজ্ঞান বনাম মানুষের ইন্দ্রিয়
প্রকৃতির এই সমীকরণটি আমাদের একটি চমৎকার সত্য শেখায়। মানবজাতি প্রযুক্তিগতভাবে যতই উন্নত হোক না কেন, পৃথিবীর কোনো আধুনিক বা সংবেদনশীল যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি যা দিয়ে সমুদ্রের পানির স্তরের এই ০.০০০০০০০০০০২৭৭ মিলিমিটারের হ্রাস পরিমাপ করা সম্ভব।
তাহলে শেষ পর্যন্ত উত্তরটি কী দাঁড়াল? সমুদ্র থেকে এক বালতি পানি তুললে কি পানি কমে?
উত্তরটি একাধারে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। আপনি যদি খালি চোখ, মানুষের ইন্দ্রিয় কিংবা পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক পরিমাপক যন্ত্রের কথা ভাবেন, তবে উত্তরটি হলো—না, সমুদ্রের পানি বিন্দুমাত্র কমেনি।
কিন্তু আপনি যদি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং পরম সত্যের কাঠগড়ায় বিষয়টিকে দাঁড় করান, তবে উত্তরটি হলো—হ্যাঁ, সমুদ্রের পানি অবশ্যই কমেছে। পরিবর্তনটা আমাদের চোখে অদৃশ্য হতে পারে, কিন্তু খাতা-কলমের হিসাবে সমুদ্র কিন্তু তার বুক থেকে এক বালতি পানি ঠিকই হারিয়েছে। শূন্য আর অতি ক্ষুদ্রের মধ্যে যে একটি তাত্ত্বিক ফারাক রয়েছে—এক বালতি পানি কমে যাওয়ার এই বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 















