ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তর পেরিয়ে দেশ এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হওয়ার অভিমুখে। এই যাত্রায় সাধারণ মানুষের হাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো মোবাইল সংযোগ। তবে বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় নতুন একটি মোবাইল সিম কার্ড কিনতে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের একটি বড় ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর তা হলো সিম প্রতি নির্ধারিত ৩০০ টাকার একক কর (Tax)।
দীর্ঘদিন ধরে বলবৎ থাকা এই নিয়মের কারণে সিমের মূল দামের চেয়ে করের পরিমাণই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির দ্বন্দ্ব
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) দীর্ঘদিন ধরেই সিম বিক্রির ওপর এই নির্দিষ্ট কর আদায় করে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে একে রাজস্ব আহরণের একটি বড় এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্র পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল জোগাতে এই কর বড় ভূমিকা রাখছে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৩০০ টাকার কর সরাসরি দেশের ‘ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি’ (Digital Inclusion) প্রক্রিয়ার গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, যাদের জন্য মোবাইল সংযোগ বিলাসবহুল কোনো পণ্য নয় বরং মৌলিক প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে, তাদের জন্য শুরুতেই ৩০০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হওয়া একটি বড় বাধা।
মোবাইল অপারেটরদের উদ্বেগ
দেশের প্রধান মোবাইল টেলিকম অপারেটরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই কর প্রত্যাহারের বা যৌক্তিক পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে ডেটা এবং কলরেট বিশ্বের অন্যতম সাশ্রয়ী হলেও, সিমের ওপর এই করের বোঝা নতুন গ্রাহক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
অপারেটরদের দাবি, সিমের ওপর থেকে এই করের চাপ কমলে নতুন গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সরকারের ডেটা ব্যবহার ও অন্যান্য ভ্যাট খাত থেকে আরও বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব আয়ের পথ সুগম হতে পারে।
গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, “আজকাল সিমের দাম বলতে গেলে কিছুই না। কিন্তু কিনতে গেলে ৩০০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে করের জন্য। যারা একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য সংযোগ নিতে চান, তাদের জন্য এই খরচটা হঠাৎ করেই অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়।”
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
বাজেট আসে, বাজেট যায়; কিন্তু সিমের ওপর থাকা এই ৩০০ টাকার কর কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন সহজে দেখা যায় না। বর্তমান সময়ে যখন ক্যাশলেস সোসাইটি বা কাগজের টাকাবিহীন লেনদেনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম এই সিম কার্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি সচল রাখতে এবং প্রান্তিক মানুষকে ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনতে সিমের ওপর করের বোঝা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং সাধারণ মানুষের প্রযুক্তির অধিকার—এই দুয়ের মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









