সারাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, কোথাও কোথাও বন্যার মত পরিস্থিতি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন। যেমন রাস্তায় জলাবদ্ধতা, যানজট, যানবাহনের সংকট বা নৌকা/রিকশার ওপর নির্ভরশীলতা, প্রান্তিক অঞ্চলের কোন কোন জায়গায় রাস্তায় ডুবে গেছে বন্যার পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে, এমত অবস্থায় পরীক্ষাকেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছানো কঠিন ছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে মানসিক চাপ , এমনকি সারাদেশে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে, এদের ভবিষ্যৎ কি? বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রবেশপত্র বা অন্যান্য কাগজপত্র ভিজে গিয়েছে। তিন চার ঘন্টা ভেজা কাপড় শরীরে থাকলে ঠান্ডা, জ্বর, সর্দি, কাশি বা অন্যান্য অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। নোংরা পানিতে হাঁটলে সংক্রমণের আশঙ্কাও থাকে। পরীক্ষার আগে উদ্বেগ বেড়ে যায়, যা পরীক্ষার পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় পরীক্ষা বন্ধ না করে পরীক্ষার্থীদের কে কি ফার্মের মুরগির সাথে তুলনা করা যায়?
সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রী কোনভাবেই দায় এড়াতে পারে না কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পানির যে ভয়াবহতা দেখা গেল, কোন কোন জেলায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সে সমস্ত অঞ্চলের পরীক্ষা বন্ধ করার ক্ষমতায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা জেলা প্রশাসকের নেই, আছে একমাত্র মন্ত্রণালয়ের এবং বোর্ডের। তাই শিক্ষা মন্ত্রী যত উপমা দেন না কেন সেটা ধোপে টেকে না । তিনি ভুল করেছেন পরীক্ষা বন্ধ না করে। তাই তিনি ব্যর্থতার যত উপমাই দেন তা ধোপে টিকবে না এবং তার পদত্যাগ চাওয়া অবাঞ্চনীয় নয়।
কোনো কোনো কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সমস্যা, স্যাঁতসেঁতে কক্ষ বা অন্যান্য অবকাঠামোগত অসুবিধা দেখা গিয়েছে। মিডিয়ার কল্যাণে দেখেছি কোন এক কলেজে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী ছাতা মাথায় দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখছে। ফার্মের মুরগি” কথাটি সাধারণত একটি রূপক বা অবমাননাকর উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখন অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা মন্ত্রীকে মুরগি মিলন বলে ডাকছে এর সুযোগ মন্ত্রী-ই করে দিয়েছেন তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের মাধ্যমে !
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন-এর “ফার্মের মুরগি” মন্তব্যটি ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশেষ করে একজন জননেতা বা মন্ত্রী, শিক্ষার্থীদের “ফার্মের মুরগি” বলে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য করেছেন। এই ধরনের বক্তব্য সাধারণত বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়। শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন “আমি মিটিংয়ে বলেছিলাম—এরা তো ফার্মের মুরগি, এগুলো তো মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে।”অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মনে করেন, “ফার্মের মুরগি” উপমাটি শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন ও অসম্মান করেছে । ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় ।
মন্ত্রী দাবি করেন যে তার উদ্দেশ্য ছিল একটি উপমা দিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা, শিক্ষার্থীদের অপমান করা নয়। তবে অনেক শিক্ষার্থী ও পর্যবেক্ষকের মতে, ব্যবহৃত শব্দচয়ন অনুপযুক্ত ছিল এবং সেটিই বিতর্কের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা দেশজুড়ে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া, ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র, এবং শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা রাজপথে বিক্ষোভ করছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলতি জুলাই মাসে বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানান। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকায় আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। আন্দোলনকারীরা ঢাকার সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ, শিক্ষা ভবন, জাতীয় সংসদ ভবন ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য এবং সরকারের কৌশল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের মতই শোনা যাচ্ছে। বিগত ইতিহাস এদেরকে শিক্ষা দিতে পারেনি। বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন না করে অবজ্ঞা করে তার ফল ভোগ করছে।
মনে পড়ে আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, ২০০২ সালের মে মাসে রামপুরায় ২০ মাসের শিশু নওশিন ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর একটি বিতর্কিত মন্তব্য। তিনি এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’। আমরা সাধারন পাবলিক অনেক সময় এই প্রবাদটি ব্যবহার করে থাকি কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই কথাটি চলে না ।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা দিবেন নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিবেন এটাই চাওয়া ছিল। দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বা গ্রেফতার করবেন এটা না বলে উনি উপরোক্ত প্রবাদটি ব্যবহার করেছেন। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মানুষের চরম ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দেয়। এই বিখ্যাত বা কুখ্যাত উক্তিটি দায়িত্বশীল পদে থেকে এই ধরনের অসংবেদনশীল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা রাতেই রাজপথে নেমে আসেন এবং “তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!” স্লোগান দিয়ে এই অবমাননার জবাব দেন, চীন সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা সুবিধা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে? শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘রাজাকার’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা, তারা বরং উপহাসমূলকভাবে এই ‘রাজাকার’ ট্যাগটি নিজেদের গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের মেয়েরা গভীর রাতে রাস্তায় নেমে আসে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, এই একটিমাত্র মন্তব্য আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের গণআন্দোলনে পরিণত করে, পরবর্তীতে এই আন্দোলন সরকার পতনের একদফা দাবিতে পরিণত হয়, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণ প্রজন্মের এক বড় ধরনের প্রতিবাদ ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। আর এই জেনজিরা যে পারে এটা সরকার কি মনে রাখতে হবে। কোটা না মেধা এই আন্দোলন সরকারের পতন ঘটিয়ে পুরো একটি দলকে দেশ ছাড়া করেছে। তাই বর্তমান সরকারকে এগুলো মনে রেখেই সতর্কভাবে কথা বলা উচিত। চেয়ারের ওজন বুঝতে হবে, জনতার পালস বুঝতে হবে, নেতৃত্ব ও মন্ত্রিত্ব এত সহজ নয়! আর যারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে তারা আঁস্তাকুড়ে চলে গেছে। ২৪ তার-ই উদাহরণ।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জাতীয় সংসদে নিজের চেয়ার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “দূর থেকে এই চেয়ারটিকে দেখতে খুব আরামদায়ক মনে হলেও বাস্তবে এটি মোটেও আরামদায়ক নয়। এই চেয়ারে বসলে আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি যে আগুনের তপ্ত হিট বা তাপ আসছে।” সরকার প্রধানের আসনটি কেবল সম্মানের নয়, এটি অত্যন্ত কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ একটি জায়গা। তিনি চেয়ারটিকে তপ্ত আগুনের সাথে তুলনা করেন এবং বলেন, এই চেয়ারে বসা মানেই দায়িত্বের তীব্র তাপ ও চাপ প্রতিনিয়ত অনুভব করা। সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যেন সবাই মিলে এই চেয়ার ও সংসদের পবিত্রতা রক্ষা করেন এবং দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন আর আপনি মন্ত্রী হয়ে চেয়ারের ওজন বুঝতে পারেননি। তাই পদত্যাগ করা উচিত। কারণ আপনাদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য সরকারের উপরে বর্তায়।
লেখক : কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
মুহাম্মদ আমির হোসেন 


























