শিরোনাম :

বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে দিতে চায় সরকার, শঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা

খাতা-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে, তবু লোডশেডিং থেকে মুক্তি মেলেনি সাধারণ মানুষের। দিনের পর দিন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার ফলে ক্রমাগত বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের চাপ। সব মিলিয়ে নানামুখী সংকটে জর্জরিত দেশের বিদ্যুৎ খাত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে পনেরোটি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তার একটি বিদ্যুৎ। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু এত বরাদ্দের পরও চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে।

এই সংকট সামলাতে এবার এক বড় পরিবর্তনের কথা ভাবছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ- বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

যা বলছে সরকার

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ সরকারের হাতে থাকলেও খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এবং এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মন্ত্রীর ভাষায়, “ডিস্ট্রিবিউশনটা আমরা প্রাইভেট করতে চাই এবং প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ গিভেন মি কনসেন্ট, ইউ গো অ্যাহেড।”

বর্তমানে সব উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নির্ধারিত দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি। সমস্যা হলো, পিডিবি যে দামে বিদ্যুৎ কেনে, তার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এই লোকসান পোষাতে সরকারকে গুনতে হয় বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি।

মন্ত্রী দাবি করেছেন, বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের দায় নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে বর্তমান সরকার। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন তারা। শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বেসরকারি খাতে দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

মন্ত্রীর যুক্তি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলে দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় নিশ্চিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত সহায়ক হবে ভর্তুকির বোঝা কমাতে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স ও দিল্লিতে আদানির মডেলের কথা টেনে বলেন, “কলকাতায় গোয়েঙ্কারা চালাচ্ছে, বোম্বেতে রিলায়েন্স চালাচ্ছে, দিল্লিতে আদানি- দে আর রানিং ভেরি ওয়েল, তো আমাদের কোম্পানিরা কেন পারবে না চালাতে?”

বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে বিদ্যুৎ বিল আরও বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেন, “বিদ্যুৎ বিল তো এমনিতেই বাড়াতে হবে, আমরা ১৭ টাকায় কিনে আট টাকায় বিক্রি করছি- সরকার আর কত ভর্তুকি দিতে পারবে?”

তার মতে, বিদ্যুতের সরবরাহ, চুরি ঠেকানো এবং বিল আদায় কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাত ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। তিনি বলেন, “আমরা তো চেষ্টা করলাম, সরকার নিজেই কোম্পানি পলিসিতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চালালো, কই খুব একটা তো লাভ হলো না। তাই আমরা বেসরকারি খাতে এই দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না ভাবছি, যাতে মানুষ সেবাটা ঠিক মতো পায়।”

তবে এই সিদ্ধান্ত যে এখনই বাস্তবায়ন হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী। তার ভাষায়, “আমরা এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছি, স্টাডি করছি যে কীভাবে বিষয়টিকে যৌক্তিক করা যায়।” পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানান তিনি এবং সেইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

মন্ত্রীর কথায়, “ভর্তুকি যেটা দিচ্ছি, সেটাও সাধারণ মানুষের টাকা, আবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেটাও দিচ্ছে ওই গ্রাহকই, দুই জায়গায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতি ঠিক করতেই সরকার চিন্তাভাবনা করছে।”

পাওয়ার সেলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদ্যুতের মোট গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ কোটি ১৯ হাজার। এত বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠীর সেবা যদি বেসরকারি খাতের হাতে যায়, তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

বিশেষজ্ঞদের সংশয়

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলেই যে বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতা কমে আসবে, এমনটা মনে করছেন না জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। বরং এর ফলে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে বলেই মত তাদের।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের নীতিগত দুর্বলতার কারণেই গত দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও লোডশেডিং কমেনি। তাদের মতে, বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়ার আগে এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই জরুরি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলছেন, “দেশের জ্বালানি খাতে ভয়াবহ জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। যা উত্তরণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

তার মতে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে বেসরকারিকরণের পথে গেলে বরং গ্রাহকের ব্যয় আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির উদাহরণ টানছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “পুরোপুরি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ কখনই সম্ভব হয়নি। বরং প্রাইভেটাইজেশনের চাপে রেগুলেটরি কালচারও ধ্বংস হয়ে গেছে।”

জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও আপত্তি রয়েছে অনেকের। অধ্যাপক শামসুল আলমের ভাষায়, “বিইআরসির ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, রেগুলেটরি সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। এখন পুরো খাত পুনর্গঠন না করে যদি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বড় ধরনের সর্বনাশ হবে। এর ফলে সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।”

বেসরকারিকরণের সম্ভাব্য সুফল

তবে সব বিশেষজ্ঞই যে একমত, তা নয়। ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বেসরকারিকরণের কিছু সুফলও থাকতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তাদের মতে, বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে সরকারি দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমতে পারে। এর পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানো এবং বকেয়া আদায়ও দ্রুত হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশ এই মডেলে সফল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

কিন্তু এক্ষেত্রে শর্ত একটাই- শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকতে হবে। তাই বেসরকারি খাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের বদলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়, সেই পথেই হাঁটতে বলছেন তারা সরকারকে।

অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশ্ন তুলে বলেন, “প্রতি মুহূর্তে এই খাতে ফৌজদারি কর্মকাণ্ড ঘটছে- সরকার নিজে বলছে চুরি হচ্ছে। কোনো একটা অপরাধের শাস্তি, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা দিয়েছে? যেসব দেশের উদাহরণ সরকার দিচ্ছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা এতটা নিষ্ক্রিয় নয়।”

এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও। তিনি বলেন, “ডেসকো, পিজিসিবির শেয়ার সরকারের হাতেও আছে, বাজারেও ছাড়া হয়েছে। এতে কী উন্নতি হয়েছে, তার আলোচনা প্রয়োজন। প্রাইভেটে গেলেই বড় পরিবর্তন আসবে- এটা ঠিক না।”

এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক খাতে লুটপাটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “ব্যাংকে লুটপাটের পর আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।”

দেড় দশকের অব্যবস্থাপনার চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চিত্রটি ছিল মূলত অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প আর আমদানি নির্ভরতার এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। বিশেষ করে কুইক রেন্টালের নামে যত্রতত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং অলস বসিয়ে রেখে হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধের সংস্কৃতি পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অব্যবস্থাপনা, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা এবং আমদানি প্রবণতা- দুটোই আগে থেকেই বেড়েছে। এবার বিদ্যুতের খুচরা বিতরণ ব্যবস্থাপনাও বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যায় কি না, সেই আলোচনা সামনে আনল সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যুৎ ও তেলের মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে? এছাড়া আর্থিক চাপ কমাতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে এবং সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে বা শিল্প খাতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যেসব শঙ্কা

বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বেসরকারি কোম্পানির মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন। কোনো অঞ্চলের একচেটিয়া দায়িত্ব পেলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।

তাদের ব্যাখ্যা, পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে খরচ বেশি, অথচ মুনাফা কম। ফলে বেসরকারি কোম্পানি সেসব এলাকায় বিনিয়োগে আগ্রহ নাও দেখাতে পারে, যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে বেসরকারিকরণ করা হলে সেখানে কর্মরত জনবলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণের নামে কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হলে পুরো খাতকেই জিম্মি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলছেন, কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর করলে রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে না। তার ভাষায়, “আগে চুক্তিগুলো রিভাইস করা দরকার। নীতিগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিতরণ বেসরকারি খাতে দিলে লাভ হবে না।”

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিশ্বের যেসব দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণ হয়েছে, সেখানে প্রথম কাজ ছিল শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যাতে গ্রাহক হয়রানি এবং অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে দমন করা যায়। অধ্যাপক আলমের আশঙ্কা, “বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিইআরসির ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নিয়ন্ত্রক দুর্বল রেখে বাজার ছেড়ে দিলে তেলের মতো বিদ্যুতের দামও নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে।”

সামনের পথ

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের এই প্রস্তাব ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল এক বাস্তবতা। একদিকে সরকার বলছে, দক্ষতা বাড়াতে ও ভর্তুকির বোঝা কমাতে এই পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী না করে দায়িত্ব হস্তান্তর করলে গ্রাহকের ভোগান্তি কমার বদলে বরং বাড়তে পারে।

সরকার অবশ্য বলছে, লাভ-ক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে তারা এবং পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত পরামর্শ হলো- আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দাঁত-নখওয়ালা করে তোলা, পুরোনো চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি করা। তা না হলে দায়িত্ব বদলালেও বিদ্যুৎ খাতের মূল সংকট রয়ে যাবে অপরিবর্তিত, বরং সাধারণ গ্রাহকের ওপর নতুন করে চাপবে দামের বোঝা।

আগামী দিনগুলোয় সরকার এই পরিকল্পনা নিয়ে ঠিক কতটা এগোয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সত্যিই শক্তিশালী করা হয় কি না- তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ চেহারা।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে দিতে চায় সরকার, শঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নিয়ে আজ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

০১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে দিতে চায় সরকার, শঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা

আপডেট সময় ০৭:২৮:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

খাতা-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে, তবু লোডশেডিং থেকে মুক্তি মেলেনি সাধারণ মানুষের। দিনের পর দিন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার ফলে ক্রমাগত বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের চাপ। সব মিলিয়ে নানামুখী সংকটে জর্জরিত দেশের বিদ্যুৎ খাত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে পনেরোটি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তার একটি বিদ্যুৎ। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু এত বরাদ্দের পরও চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে।

এই সংকট সামলাতে এবার এক বড় পরিবর্তনের কথা ভাবছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ- বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

যা বলছে সরকার

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ সরকারের হাতে থাকলেও খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এবং এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মন্ত্রীর ভাষায়, “ডিস্ট্রিবিউশনটা আমরা প্রাইভেট করতে চাই এবং প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ গিভেন মি কনসেন্ট, ইউ গো অ্যাহেড।”

বর্তমানে সব উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নির্ধারিত দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি। সমস্যা হলো, পিডিবি যে দামে বিদ্যুৎ কেনে, তার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এই লোকসান পোষাতে সরকারকে গুনতে হয় বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি।

মন্ত্রী দাবি করেছেন, বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের দায় নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে বর্তমান সরকার। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন তারা। শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বেসরকারি খাতে দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

মন্ত্রীর যুক্তি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলে দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় নিশ্চিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত সহায়ক হবে ভর্তুকির বোঝা কমাতে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স ও দিল্লিতে আদানির মডেলের কথা টেনে বলেন, “কলকাতায় গোয়েঙ্কারা চালাচ্ছে, বোম্বেতে রিলায়েন্স চালাচ্ছে, দিল্লিতে আদানি- দে আর রানিং ভেরি ওয়েল, তো আমাদের কোম্পানিরা কেন পারবে না চালাতে?”

বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে বিদ্যুৎ বিল আরও বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেন, “বিদ্যুৎ বিল তো এমনিতেই বাড়াতে হবে, আমরা ১৭ টাকায় কিনে আট টাকায় বিক্রি করছি- সরকার আর কত ভর্তুকি দিতে পারবে?”

তার মতে, বিদ্যুতের সরবরাহ, চুরি ঠেকানো এবং বিল আদায় কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাত ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। তিনি বলেন, “আমরা তো চেষ্টা করলাম, সরকার নিজেই কোম্পানি পলিসিতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চালালো, কই খুব একটা তো লাভ হলো না। তাই আমরা বেসরকারি খাতে এই দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না ভাবছি, যাতে মানুষ সেবাটা ঠিক মতো পায়।”

তবে এই সিদ্ধান্ত যে এখনই বাস্তবায়ন হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী। তার ভাষায়, “আমরা এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছি, স্টাডি করছি যে কীভাবে বিষয়টিকে যৌক্তিক করা যায়।” পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানান তিনি এবং সেইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

মন্ত্রীর কথায়, “ভর্তুকি যেটা দিচ্ছি, সেটাও সাধারণ মানুষের টাকা, আবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেটাও দিচ্ছে ওই গ্রাহকই, দুই জায়গায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতি ঠিক করতেই সরকার চিন্তাভাবনা করছে।”

পাওয়ার সেলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদ্যুতের মোট গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ কোটি ১৯ হাজার। এত বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠীর সেবা যদি বেসরকারি খাতের হাতে যায়, তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

বিশেষজ্ঞদের সংশয়

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলেই যে বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতা কমে আসবে, এমনটা মনে করছেন না জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। বরং এর ফলে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে বলেই মত তাদের।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের নীতিগত দুর্বলতার কারণেই গত দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও লোডশেডিং কমেনি। তাদের মতে, বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়ার আগে এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই জরুরি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলছেন, “দেশের জ্বালানি খাতে ভয়াবহ জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। যা উত্তরণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

তার মতে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে বেসরকারিকরণের পথে গেলে বরং গ্রাহকের ব্যয় আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির উদাহরণ টানছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “পুরোপুরি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ কখনই সম্ভব হয়নি। বরং প্রাইভেটাইজেশনের চাপে রেগুলেটরি কালচারও ধ্বংস হয়ে গেছে।”

জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও আপত্তি রয়েছে অনেকের। অধ্যাপক শামসুল আলমের ভাষায়, “বিইআরসির ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, রেগুলেটরি সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। এখন পুরো খাত পুনর্গঠন না করে যদি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বড় ধরনের সর্বনাশ হবে। এর ফলে সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।”

বেসরকারিকরণের সম্ভাব্য সুফল

তবে সব বিশেষজ্ঞই যে একমত, তা নয়। ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বেসরকারিকরণের কিছু সুফলও থাকতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তাদের মতে, বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে সরকারি দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমতে পারে। এর পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানো এবং বকেয়া আদায়ও দ্রুত হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশ এই মডেলে সফল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

কিন্তু এক্ষেত্রে শর্ত একটাই- শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকতে হবে। তাই বেসরকারি খাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের বদলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়, সেই পথেই হাঁটতে বলছেন তারা সরকারকে।

অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশ্ন তুলে বলেন, “প্রতি মুহূর্তে এই খাতে ফৌজদারি কর্মকাণ্ড ঘটছে- সরকার নিজে বলছে চুরি হচ্ছে। কোনো একটা অপরাধের শাস্তি, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা দিয়েছে? যেসব দেশের উদাহরণ সরকার দিচ্ছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা এতটা নিষ্ক্রিয় নয়।”

এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও। তিনি বলেন, “ডেসকো, পিজিসিবির শেয়ার সরকারের হাতেও আছে, বাজারেও ছাড়া হয়েছে। এতে কী উন্নতি হয়েছে, তার আলোচনা প্রয়োজন। প্রাইভেটে গেলেই বড় পরিবর্তন আসবে- এটা ঠিক না।”

এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক খাতে লুটপাটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “ব্যাংকে লুটপাটের পর আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।”

দেড় দশকের অব্যবস্থাপনার চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চিত্রটি ছিল মূলত অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প আর আমদানি নির্ভরতার এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। বিশেষ করে কুইক রেন্টালের নামে যত্রতত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং অলস বসিয়ে রেখে হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধের সংস্কৃতি পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অব্যবস্থাপনা, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা এবং আমদানি প্রবণতা- দুটোই আগে থেকেই বেড়েছে। এবার বিদ্যুতের খুচরা বিতরণ ব্যবস্থাপনাও বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যায় কি না, সেই আলোচনা সামনে আনল সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যুৎ ও তেলের মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে? এছাড়া আর্থিক চাপ কমাতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে এবং সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে বা শিল্প খাতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যেসব শঙ্কা

বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বেসরকারি কোম্পানির মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন। কোনো অঞ্চলের একচেটিয়া দায়িত্ব পেলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।

তাদের ব্যাখ্যা, পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে খরচ বেশি, অথচ মুনাফা কম। ফলে বেসরকারি কোম্পানি সেসব এলাকায় বিনিয়োগে আগ্রহ নাও দেখাতে পারে, যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে বেসরকারিকরণ করা হলে সেখানে কর্মরত জনবলের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণের নামে কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হলে পুরো খাতকেই জিম্মি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলছেন, কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর করলে রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে না। তার ভাষায়, “আগে চুক্তিগুলো রিভাইস করা দরকার। নীতিগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিতরণ বেসরকারি খাতে দিলে লাভ হবে না।”

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিশ্বের যেসব দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণ হয়েছে, সেখানে প্রথম কাজ ছিল শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যাতে গ্রাহক হয়রানি এবং অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে দমন করা যায়। অধ্যাপক আলমের আশঙ্কা, “বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিইআরসির ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নিয়ন্ত্রক দুর্বল রেখে বাজার ছেড়ে দিলে তেলের মতো বিদ্যুতের দামও নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে।”

সামনের পথ

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের এই প্রস্তাব ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল এক বাস্তবতা। একদিকে সরকার বলছে, দক্ষতা বাড়াতে ও ভর্তুকির বোঝা কমাতে এই পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী না করে দায়িত্ব হস্তান্তর করলে গ্রাহকের ভোগান্তি কমার বদলে বরং বাড়তে পারে।

সরকার অবশ্য বলছে, লাভ-ক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে তারা এবং পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত পরামর্শ হলো- আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দাঁত-নখওয়ালা করে তোলা, পুরোনো চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি করা। তা না হলে দায়িত্ব বদলালেও বিদ্যুৎ খাতের মূল সংকট রয়ে যাবে অপরিবর্তিত, বরং সাধারণ গ্রাহকের ওপর নতুন করে চাপবে দামের বোঝা।

আগামী দিনগুলোয় সরকার এই পরিকল্পনা নিয়ে ঠিক কতটা এগোয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সত্যিই শক্তিশালী করা হয় কি না- তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ চেহারা।

Share this news as a Photo Card