দেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শুধু রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়, বরং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্য পূরণের পথে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দেবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা এই পাটকলগুলো শুধু কিছু কারখানার ভবন নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্পন্দন। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছিল, পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই বাস্তবতা থেকেই সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে কারখানাগুলো পুনরায় সচল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া কোনো অর্থনীতি টেকসই গতি পেতে পারে না। সরকার একা সবকিছুর দায়িত্ব নিয়ে অগ্রসর হতে পারে না, বরং উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেখানে বিনিয়োগ আটকে থাকে সেখানে কর্মসংস্থানও থমকে যায়, আর কর্মসংস্থান থমকে গেলে সমাজে অস্থিরতা বাড়ে। তাই উৎপাদনমুখী শিল্প খাতকে সচল রাখতে যা যা করণীয়, সরকার তার সবটুকুই করতে প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, পাটশিল্প একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া এবং ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে এই খাত একসময় ধুঁকতে শুরু করে। তবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনাও নতুন করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, বস্তা এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পজাত পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো শুধু পুনরুজ্জীবিতই হবে না, নতুন করে রপ্তানি আয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, লিজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারখানাগুলো এখন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে, তবে সরকার এই প্রক্রিয়া তদারকিতে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রাখবে যাতে শ্রমিকদের স্বার্থ কোনোভাবেই উপেক্ষিত না হয়। যারা দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটিকে অনুরোধ জানান তিনি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পাটশিল্প নয়, দেশের প্রতিটি সম্ভাবনাময় খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো এবং উদ্যোক্তাদের জন্য একক জানালা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠান নতুন করে দাঁড় করাতে যেমন সাহস প্রয়োজন হয়, তেমনি প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক নীতিগত স্থিতিশীলতা। সরকার এই দুটি বিষয়ই নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি আরও জানান, অর্থনৈতিক শক্তিশালী অবস্থান বলতে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বোঝায় না, বরং তার সুফল যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায়, সেটিই আসল লক্ষ্য। শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে তরুণ প্রজন্ম দেশেই তাদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, লিজ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে হবে। এই প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একটি পৃথক মনিটরিং কমিটি গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় সচল করার এই উদ্যোগ সরকারের বেসরকারিকরণ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই প্রক্রিয়া সফল করতে হলে শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার পরিকল্পনার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে বলেও মত দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে, পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার সুযোগ কাজে লাগাতে দেশের পাটশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে তাদের পর্যবেক্ষণে।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের এই যৌথ প্রয়াস দেশের শিল্পখাতে নতুন গতির সঞ্চার করবে। বন্ধ কারখানার দুয়ার আবার খুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হবে, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে একধাপ সামনে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা অর্জনই যে সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য, তা তিনি ফের স্মরণ করিয়ে দেন উপস্থিত সকলের কাছে।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















