ডিজিটাল লেনদেনের জগতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ঘোষণা এলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। দেশজুড়ে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় করে তুলতে নতুন এক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে, যা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিষয়— আন্তঃব্যাংক চার্জ শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন।
বাংলা কিউআর মূলত একটি একক ও আন্তঃসংযুক্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ক্রেতা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাপ ব্যবহার করে দোকানির একটিমাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। ফলে একজন বিক্রেতাকে আর একাধিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কোড রাখতে হয় না। গত ১ জুলাই থেকে মার্চেন্ট পেমেন্টে এই ব্যবস্থা দেশজুড়ে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটানো।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো নতুন এক সিদ্ধান্ত— বাংলা কিউআরের সব লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি বা আইআরএফ সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হচ্ছে। এত দিন গ্রাহকের প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্টের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই বাবদ শূন্য দশমিক ৩৫ থেকে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ কাটা হতো, যা মোট মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেটের একটি বড় অংশ দখল করে রাখত। আইআরএফ উঠে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমবে এবং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সেই সুবিধা মার্চেন্টের ওপর আরোপিত মাশুল হ্রাসের মাধ্যমে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বোঝা দরকার— এই ‘ফ্রি’ সুবিধা মূলত আন্তঃব্যাংক পর্যায়ের নির্দিষ্ট চার্জের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চূড়ান্তভাবে কত মাশুল নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতির ওপর।
নতুন সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ১০০ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল গঠন, যা আসছে অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। এই তহবিলের লক্ষ্য মূলত ব্যক্তিপর্যায়ে নিবন্ধিত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করা। তবে এই অর্থ সরাসরি দোকানির হাতে নগদ আকারে পৌঁছাবে না। বরং লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান এই প্রণোদনা পাবে— যে প্রতিষ্ঠান দোকানের কাছে কিউআর স্থাপন করেছে, তারা পাবে লেনদেনের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ; আর গ্রাহক যে প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধ করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠান পাবে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিটি যোগ্য লেনদেনে মোট প্রণোদনার হার দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ।
হিসাবের সুবিধার্থে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কোনো ক্ষুদ্র বিক্রেতা যদি বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এক হাজার টাকার লেনদেন গ্রহণ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটি যথাক্রমে এক টাকা ও দুই টাকা করে মোট তিন টাকা প্রণোদনা পাবে। আর দুই হাজার টাকার যোগ্য লেনদেনে মোট প্রণোদনা দাঁড়াবে ছয় টাকা। উল্লেখ্য, প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থকেই হিসাবের আওতায় আনা হবে, এর বেশি অংশের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা মিলবে না।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, সরাসরি প্রণোদনা না পেলে ব্যবসায়ীর লাভ কোথায়? উত্তরটি লুকিয়ে আছে মাশুল হ্রাসের সম্ভাবনার মধ্যে। এত দিন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মোট মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট ছিল প্রায় এক থেকে সোয়া এক শতাংশ পর্যন্ত, যা অনেকের কাছেই বড় বোঝা মনে হতো। আইআরএফ শূন্য হওয়ায় এখন সেই খরচের একটি বড় অংশ কমে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, ফলে দোকানিদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকরাও নগদ অর্থ বহনের ঝক্কি ছাড়াই সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন।
তবে এই সুবিধা যাতে অপব্যবহার না হয়, সে জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বেশি প্রণোদনা পাওয়ার আশায় একটি বড় লেনদেনকে কৃত্রিমভাবে ভেঙে একাধিক ছোট লেনদেনে পরিণত করা যাবে না, আর লেনদেনের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর কোনো সুযোগও রাখা হয়নি। ব্যর্থ, বাতিল, রিভার্স, রিফান্ড কিংবা বিতর্কিত লেনদেনের বিপরীতে কোনো প্রণোদনা মিলবে না। কোনো মার্চেন্টের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই তা পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করতে হবে, আর অপব্যবহার প্রমাণিত হলে প্রণোদনার অর্থ ফেরত নেওয়া বা ভবিষ্যতের প্রণোদনার সঙ্গে সমন্বয় করার সংস্থান রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ গত ১০ আগস্ট এ–সংক্রান্ত পৃথক নির্দেশনা জারি করে। কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের ফলে একদিকে নগদনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের আগ্রহও বাড়বে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত হওয়ায় আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধিরও একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলা কিউআরকে একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পূর্ণাঙ্গ আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















