শিরোনাম :
উত্তরায় প্রধানমন্ত্রীর খালাত ভাইয়ের পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাই ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২.২৫%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। নয় বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে ঢাকা। “ভঙ্গুর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় এখন”: প্রধানমন্ত্রী ইউরোপে ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে যৌনবাহিত সংক্রমণ মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফলাফলে ধস, ফেল প্রায় ৬০ শতাংশ হাসিনার প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করতে দিল্লিকে অনুরোধ ঢাকার নিয়োগবিধি পরিবর্তনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চিত করা যাবে না: হাইকোর্ট দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং, বিপর্যস্ত জনজীবন এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ আজ, জানা যাবে যেভাবে ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন সিদ্ধান্তে সহজ হলো ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুকিং প্রক্রিয়া

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২.২৫%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। নয় বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে ঢাকা।

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবারও রাজধানীর দাপট অব্যাহত রয়েছে। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির নিরিখে দেশের নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষায় সারাদেশে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, আর সর্বোচ্চ ফলাফল অর্থাৎ জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। এই বিপুলসংখ্যক কৃতী শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটিই এসেছে ঢাকা বোর্ড থেকে, যেখানে পাসের হার পৌঁছেছে ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন।

সোমবার রাজধানীর সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। ফল প্রকাশের পর বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, ঢাকার পরই সবচেয়ে ভালো ফল করেছে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড। সেখানে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। এরপরই রয়েছে যশোর বোর্ডের অবস্থান, যেখানে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা প্রকৃতপক্ষে ঢাকার পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাসের হার হিসেবে উঠে এসেছে। এই বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন শিক্ষার্থী।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮১৪ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার কিছুটা কম, ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ৯ হাজার ৩৯৮ জন, যা তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় তারা এগিয়ে আছে, মোট ১৩ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে সেখান থেকে।

তালিকার নিচের দিকে রয়েছে সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ড। সিলেটে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ২ হাজার ৭৭৮ জন। আর সবচেয়ে কম পাসের হার দেখা গেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে, যেখানে এই হার ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন শিক্ষার্থী।

এই ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন। তিনি জানান, এবারের ফলাফল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও দক্ষতার শতভাগ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ বাড়ানোর যে সংস্কৃতি চালু ছিল, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে।’

শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায়, গত ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তিনি জানান, এবারই প্রথমবারের মতো সারাদেশে একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বডি ওন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল, আর শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে শতভাগ নিরপেক্ষতা ও নির্মোহতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, ফলাফল ঠিক সেভাবেই এসেছে। এর ফলে ফলাফলের ভালো বা মন্দের দিকে না তাকিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এটিই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন।’ যেসব শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের উদ্দেশে সান্ত্বনার সুরে তিনি বলেন, ‘তাদের ভেঙে পড়ার কিছু নেই। সরকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাশে রয়েছে।’

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ড. মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মনির্ভরশীলতা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

চলমান শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যক্রম পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন চারটি বই যুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘স্টার্টআপ কম্পিটিশন’ এবং একটি ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

এর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির যথাযথ সন্নিবেশ এবং শিক্ষায় প্রযুক্তির সঠিক সংমিশ্রণ অর্থাৎ টেকনোলজিক্যাল ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করতে শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা।

পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করায় তিনি শিক্ষক, অভিভাবক, পরীক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে তিনি একটি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করেছে, তাদের কৃতিত্ব তুলে ধরে অনুপ্রেরণা দিন। আর যেসব জায়গায় ঘাটতি বা সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সবাই মিলে সমন্বিতভাবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কাজ করি।’

এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা ও প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি তথা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরাও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ফলাফল ঘোষণা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ফলাফলের বিচারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড, আর সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ড। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায়ও এই ব্যবধান স্পষ্ট। যেখানে ঢাকা বোর্ড থেকে ৩৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে, সেখানে সিলেট ও বরিশাল বোর্ডে এই সংখ্যা তিন হাজারের ঘরে সীমাবদ্ধ। শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, এই বৈষম্য দূর করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, আর সে লক্ষ্যেই তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনার এই প্রচেষ্টা—বিশেষ করে একক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, কেন্দ্রে নজরদারি বৃদ্ধি এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ—দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বোর্ডভিত্তিক ফলাফলের এই তারতম্য একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা ও মানের মধ্যে এখনো যথেষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে, যা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এবারের ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন লাখো শিক্ষার্থীর কয়েক মাসের প্রতীক্ষার অবসান হলো, তেমনি অন্যদিকে সামনে চলে এলো দেশের শিক্ষা খাতে বিদ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্রও। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এই ফলাফল কোনো কৃত্রিম প্রক্রিয়ার ফসল নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অধ্যবসায় ও প্রস্তুতির প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে ঘোষিত সংস্কার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয়ে বোর্ডভিত্তিক এই ব্যবধান কতটা কমিয়ে আনতে পারে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

উত্তরায় প্রধানমন্ত্রীর খালাত ভাইয়ের পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাই

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন সিদ্ধান্তে সহজ হলো ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুকিং প্রক্রিয়া

১০ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২.২৫%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। নয় বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে ঢাকা।

আপডেট সময় ০৭:৫৮:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবারও রাজধানীর দাপট অব্যাহত রয়েছে। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির নিরিখে দেশের নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষায় সারাদেশে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, আর সর্বোচ্চ ফলাফল অর্থাৎ জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। এই বিপুলসংখ্যক কৃতী শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটিই এসেছে ঢাকা বোর্ড থেকে, যেখানে পাসের হার পৌঁছেছে ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন।

সোমবার রাজধানীর সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। ফল প্রকাশের পর বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, ঢাকার পরই সবচেয়ে ভালো ফল করেছে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড। সেখানে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। এরপরই রয়েছে যশোর বোর্ডের অবস্থান, যেখানে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা প্রকৃতপক্ষে ঢাকার পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাসের হার হিসেবে উঠে এসেছে। এই বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন শিক্ষার্থী।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮১৪ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার কিছুটা কম, ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ৯ হাজার ৩৯৮ জন, যা তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় তারা এগিয়ে আছে, মোট ১৩ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে সেখান থেকে।

তালিকার নিচের দিকে রয়েছে সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ড। সিলেটে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ২ হাজার ৭৭৮ জন। আর সবচেয়ে কম পাসের হার দেখা গেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে, যেখানে এই হার ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন শিক্ষার্থী।

এই ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন। তিনি জানান, এবারের ফলাফল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও দক্ষতার শতভাগ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ বাড়ানোর যে সংস্কৃতি চালু ছিল, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে।’

শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায়, গত ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তিনি জানান, এবারই প্রথমবারের মতো সারাদেশে একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বডি ওন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল, আর শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে শতভাগ নিরপেক্ষতা ও নির্মোহতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, ফলাফল ঠিক সেভাবেই এসেছে। এর ফলে ফলাফলের ভালো বা মন্দের দিকে না তাকিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এটিই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন।’ যেসব শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের উদ্দেশে সান্ত্বনার সুরে তিনি বলেন, ‘তাদের ভেঙে পড়ার কিছু নেই। সরকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাশে রয়েছে।’

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ড. মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মনির্ভরশীলতা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

চলমান শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যক্রম পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন চারটি বই যুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘স্টার্টআপ কম্পিটিশন’ এবং একটি ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

এর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির যথাযথ সন্নিবেশ এবং শিক্ষায় প্রযুক্তির সঠিক সংমিশ্রণ অর্থাৎ টেকনোলজিক্যাল ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করতে শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা।

পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করায় তিনি শিক্ষক, অভিভাবক, পরীক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে তিনি একটি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করেছে, তাদের কৃতিত্ব তুলে ধরে অনুপ্রেরণা দিন। আর যেসব জায়গায় ঘাটতি বা সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সবাই মিলে সমন্বিতভাবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কাজ করি।’

এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা ও প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি তথা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরাও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ফলাফল ঘোষণা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের নয়টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ফলাফলের বিচারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড, আর সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ড। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায়ও এই ব্যবধান স্পষ্ট। যেখানে ঢাকা বোর্ড থেকে ৩৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে, সেখানে সিলেট ও বরিশাল বোর্ডে এই সংখ্যা তিন হাজারের ঘরে সীমাবদ্ধ। শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, এই বৈষম্য দূর করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, আর সে লক্ষ্যেই তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনার এই প্রচেষ্টা—বিশেষ করে একক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, কেন্দ্রে নজরদারি বৃদ্ধি এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ—দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বোর্ডভিত্তিক ফলাফলের এই তারতম্য একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা ও মানের মধ্যে এখনো যথেষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে, যা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এবারের ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন লাখো শিক্ষার্থীর কয়েক মাসের প্রতীক্ষার অবসান হলো, তেমনি অন্যদিকে সামনে চলে এলো দেশের শিক্ষা খাতে বিদ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্রও। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এই ফলাফল কোনো কৃত্রিম প্রক্রিয়ার ফসল নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অধ্যবসায় ও প্রস্তুতির প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে ঘোষিত সংস্কার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয়ে বোর্ডভিত্তিক এই ব্যবধান কতটা কমিয়ে আনতে পারে।

Share this news as a Photo Card