বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় বলবৎ থাকা বিধিমালা উপেক্ষা করে পরবর্তীতে প্রণীত কোনো শর্ত পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই বলে গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত একটি রিট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে এই পর্যবেক্ষণ উঠে আসে বিচারিক আদেশে।
চার শিক্ষকের দায়ের করা রিট আবেদনের ভিত্তিতে জারি হওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। গত ৩০ জুন দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ থেকে রায়টি দেওয়া হলেও এর পূর্ণাঙ্গ কপি সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি রায়ের মূল অংশ রচনা করেন। শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষে একজন আইনজীবী এবং রাষ্ট্রপক্ষে দুইজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অংশ নেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে, তৎকালীন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধান অনুসরণ করে নাটোরের একটি মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিষয়ে প্রভাষক পদে চারজন শিক্ষক নিয়োগ পান সেই বছরের ডিসেম্বরে। নিয়োগের ঠিক পরদিনই তারা কর্মস্থলে যোগদান করেন।
পাঁচ বছর পর, ২০২০ সালের এপ্রিলে কলেজটি সরকারি বেতন-ভাতা কর্মসূচির (এমপিও) আওতাভুক্ত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতি অনুযায়ী, শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের পরিপত্র জারির আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত এবং ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছিল। এই শর্ত পূরণ করায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকাশিত তালিকায় চার শিক্ষকের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইনে আবেদন যাচাইকালে তাদের নিবন্ধন সনদ না থাকার অজুহাতে আবেদন বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।
রায়ে আদালত মন্তব্য করেন, নিয়োগকর্তার প্রশাসনিক প্রয়োজনে চাকরিবিধি সংশোধনের এখতিয়ার থাকলেও তা আগে থেকে কর্মরত কর্মীদের অর্জিত অধিকার খর্ব করতে পারে না। আদালত আরও উল্লেখ করেন, যে সময় এই চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তখন সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ডিগ্রি পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এই শর্ত প্রথম যুক্ত হয় ২০১৯ সালের সংশোধিত প্রবিধানে।
রাষ্ট্রপক্ষের এই যুক্তি যে তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোয় নেই, তা প্রত্যাখ্যান করে আদালত বলেন, সরকার নিজেই একাধিক পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ফলে এমন দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। পাশাপাশি আদালত স্পষ্ট করেন, এমপিও মঞ্জুরি নীতিগতভাবে সরকারের এখতিয়ারভুক্ত হলেও তা যদি যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশিমতো নেওয়া হয়, তবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
সবশেষে আদালত নিবন্ধন সনদ না থাকার অজুহাতে আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে চার আবেদনকারীর নাম মাসিক বেতন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত সময় থেকে প্রযোজ্য সকল বকেয়া আর্থিক সুবিধা পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই রায়কে শিক্ষা খাতের অধিকারবঞ্চিত শিক্ষকদের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিরোনাম :
নিয়োগবিধি পরিবর্তনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চিত করা যাবে না: হাইকোর্ট
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০২:১১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- 4
জনপ্রিয় সংবাদ




















