শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ঢাকার আপত্তি উপেক্ষা করেই নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এই ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টায় নতুন করে বাধা তৈরি করছে কিনা, তা নিয়ে এখন কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গত ৫ আগস্ট দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের আয়োজনে ওই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সাকিব আল হাসান। সেখানে অডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন তিনি। প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি ও অসংখ্য মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার দায় থাকা সত্ত্বেও তার বক্তব্যে অনুতাপের কোনো ছাপ ছিল না বলে সমালোচনা উঠেছে।
এই ঘটনার আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল ভারতকে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। পতিত সরকারপ্রধানকে যেন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ না দেওয়া হয়, সে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদও। তবে এসব অনুরোধ কার্যকর প্রভাব ফেলেনি বলেই মনে হচ্ছে, কারণ পূর্বঘোষণা অনুযায়ীই ভারতের মাটিতে বসে সংবাদ সম্মেলন সম্পন্ন করেন সাবেক এই সরকারপ্রধান।
ঘটনার রাতেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিকে গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় ওই বিবৃতিতে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আগেভাগেই ভারতকে অবহিত করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতাও একই সুরে সমালোচনা করেছেন।
তবে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখছেন সাবেক কূটনীতিকরা। একজন সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, এ ঘটনার ফলে সম্পর্কোন্নয়নের যে প্রক্রিয়া চলছিল, তা আর অনুকূল দিকে এগোচ্ছে না। অন্য একজন সাবেক কূটনীতিকের মতে অবশ্য, সরকারের এই প্রতিক্রিয়া কিছুটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একাধিকবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠানো হলেও ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়ের পর নোট ভারবাল পাঠিয়েও কোনো সদুত্তর আসেনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর অবশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষণীয় উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকারের উপস্থিতি এবং তার আগে সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এর উদাহরণ। পরবর্তীতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়েও সফর বিনিময় হয়।
তবে ভারতে অবস্থানরত সাবেক সরকারপ্রধানের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ ও তাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ বারবার জানানো হলেও প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেই ভারত সময় নিয়ে যাচ্ছে বলে ঢাকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটেই সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে অনেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু রয়েছে, যেগুলো আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত থাকলেও এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা ভারতের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ভারত সরকার এই আয়োজনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও তা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। তার মতে, সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অনুভূতিরই প্রতিফলন ঘটেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষেরই আন্তরিকতা প্রয়োজন। তবে ঢাকার কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব মূলত ভারতের ওপরই বর্তায়।
শিরোনাম :
হাসিনার দিল্লি বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১২:৫২:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- 8
জনপ্রিয় সংবাদ





















