আজ ১৬ আগস্ট। ১৯৭৭ সালের এই দিনে মাত্র ৪২ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছিলেন এলভিস প্রিসলি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হলেও তাঁর নামের আগে বাড়তি কোনো পরিচয় জুড়ে দিতে হয় না—শুধু ‘এলভিস’ বললেই সবাই বুঝে যান কার কথা বলা হচ্ছে। সংগীত জগতে তিনি এখনো ‘দ্য কিং’ নামে পরিচিত, আর এই খেতাব কেবল জনপ্রিয়তার প্রতিফলন নয়, বরং একটি গোটা সাংস্কৃতিক পালাবদলের সাক্ষ্য।
১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি মিসিসিপির টুপেলোতে জন্ম নেওয়া এলভিসের শৈশব কেটেছে গসপেল, ব্লুজ আর কান্ট্রি সুরের মধ্যে। পরবর্তীতে মেমফিসে গিয়ে তাঁর সংগীতবোধ আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৫৪ সালে সান রেকর্ডসে গিয়ে গান রেকর্ড করার সময়ও তিনি অখ্যাত এক তরুণ, কিন্তু সেখানেই যেন লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। এক বছর পর আরসিএর সঙ্গে চুক্তি এবং ১৯৫৬ সালে ‘হার্টব্রেক হোটেল’ গানটি তাঁকে রাতারাতি জাতীয় তারকায় পরিণত করে।
এলভিসের সংগীতভুবন কোনো একটি ঘরানায় বাঁধা ছিল না। রক অ্যান্ড রোলের উন্মাদনা যেমন তিনি তৈরি করেছেন, তেমনি গেয়েছেন প্রেমের গান, ব্যালাড, গসপেল আর কান্ট্রি সংগীতও। এই ঘরানা ভাঙার সাহসই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
তবে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কও কম নয়। তাঁর সংগীতের শিকড় গভীরভাবে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের তৈরি ব্লুজ, আরঅ্যান্ডবি ও গসপেলে। বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত সেই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের তৈরি সুর যখন শ্বেতাঙ্গ কণ্ঠে বাজারে পৌঁছাল, তখন স্বীকৃতি আর আর্থিক লাভের প্রশ্ন সামনে আসাই স্বাভাবিক ছিল। যদিও এলভিসের জীবনী ঘাঁটলে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর বর্ণবৈষম্যবিরোধী অবস্থানের প্রমাণও মেলে, যা পুরো বিতর্কটিকে জটিল করে তোলে।
মঞ্চে এলভিসের শরীরী ভাষা ছিল তাঁর গানের মতোই আলোড়ন সৃষ্টিকারী। কোমর দুলিয়ে, শরীর বাঁকিয়ে গান পরিবেশনের ধরন সেকালের রক্ষণশীল আমেরিকায় অনেকের কাছেই ছিল অস্বস্তিকর, এমনকি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষও আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা যত বেড়েছে, দর্শকের আগ্রহ তত তীব্র হয়েছে। আজকের মঞ্চ পারফরম্যান্সে শিল্পীর শরীরী উপস্থাপনার যে গুরুত্ব, তার সূচনা অনেকাংশে এলভিসের হাত ধরেই।
পোশাকেও তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ছাপ। পঞ্চাশের দশকের রঙিন জ্যাকেট, পম্পাডোর চুল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের ঝলমলে জাম্পস্যুট আর কেপ—প্রতিটি ধাপে তিনি বদলেছেন নিজের রূপ, বদলে দিয়েছেন তারকাদের পোশাকভাবনাও।
টেলিভিশনের শক্তিও তিনি বুঝেছিলেন গভীরভাবে। রেকর্ড তাঁকে তারকা বানালেও টেলিভিশন তাঁকে পৌঁছে দেয় প্রতিটি ঘরে। ১৯৭৩ সালের ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই’ অনুষ্ঠানটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একসঙ্গে বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়ে সেকালে বিরাট চমক সৃষ্টি করেছিল। সিনেমাতেও তিনি সাফল্য পেয়েছেন, ৩১টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যদিও ফর্মুলাভিত্তিক গল্পের বেড়াজালে তাঁর প্রকৃত অভিনয়প্রতিভা পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি বলেও মূল্যায়ন আছে।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি ক্যারিয়ারে খানিকটা স্থবিরতা এলেও ১৯৬৮ সালের ‘কামব্যাক কনসার্ট’ তাঁকে নতুন উদ্যমে ফিরিয়ে আনে, আর তার পরের বছর থেকে লাস ভেগাসে শুরু হয় তাঁর মঞ্চজীবনের নতুন অধ্যায়।
মৃত্যুর দিনটিও ছিল বিষাদময়। ওষুধনির্ভরতা, অতিরিক্ত ওজন আর অনিয়মিত জীবনযাপন তাঁর শরীরকে ভেঙে দিচ্ছিল ধীরে ধীরে। তাঁর ব্যবস্থাপক কর্নেল টম পার্কারের ভূমিকা নিয়েও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।
তবু এলভিস থেমে যাননি। তাঁর রেকর্ড বিক্রি হয়েছে বিশ্বজুড়ে শত কোটির বেশি, গ্রেসল্যান্ড পরিণত হয়েছে তীর্থস্থানে। প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁর কণ্ঠ, পোশাক আর ভঙ্গি অনুকরণ করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। দারিদ্র্য থেকে খ্যাতি, উত্থান থেকে পতনের এই জীবনগাথা আজও মানুষকে টানে, আর তাই ‘দ্য কিং’ তকমাটি রয়ে গেছে চিরস্থায়ী।
শিরোনাম :
মৃত্যুর ৪৯ বছর পরও এলভিস কেন এখনো ‘দ্য কিং’
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০২:০৫:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- 8
জনপ্রিয় সংবাদ


























