পাঁচ আগস্টের পর ফিরছে জঙ্গি আতঙ্ক, নজরে আল-কায়েদা

গত এক বছরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ইস্যুটি একরকম নীরবে ফিরে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে৷ পাঁচ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সেই ফাঁকফোকর গলিয়েই সংগঠিত হওয়ার সুযোগ খুঁজে নিচ্ছে উগ্রপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী৷ সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের অনেকের এখনও হদিস না মেলা, আর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে অস্বস্তি৷

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলছেন, পাঁচ আগস্টের পর ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে, এটা অস্বীকারের উপায় নেই৷ তাঁর ভাষায়, কারাগার থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে, তাদের কেউ পথ পাল্টাতে উদ্বুদ্ধ করেনি৷ ফলে যে আদর্শ নিয়ে তারা ছিল, সেই আদর্শ নিয়েই রয়ে গেছে৷ সুযোগ পেলে তারা যে সক্রিয় হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলেই মনে করেন তিনি৷ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তাঁর এই আশঙ্কাকেই যেন সত্যি প্রমাণ করছে৷

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে পরপর কয়েকটি বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর সামনে এসেছে৷ গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি তিনতলা বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট৷ সেখান থেকে একটি সন্দেহভাজন প্রেশার কুকার বা ‘কেটলি বোমা’ এবং বিপুল পরিমাণ গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির নানা উপকরণ জব্দ করা হয়৷

এর আগে ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে রাখা একটি ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ৷ আরও কিছুদিন আগে, ২৪ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে লুকানো অবস্থায় মেলে আরেকটি বোমা৷ এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ঢাকার কেরাণীগঞ্জের একটি মাদ্রাসা এবং শরিয়তপুরের জাজিরায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল৷ কেরাণীগঞ্জের সেই মাদ্রাসা বিস্ফোরণে জঙ্গিবাদ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে, যার প্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চালাচ্ছে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট৷

এসব ঘটনার মধ্যেই কিছুদিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করে বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর৷ পরিস্থিতি নিয়ে সিটিটিসির প্রধান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে তাঁরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং জামিনে বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে৷

হঠাৎ আলোচনায় আল-কায়েদা

এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস৷ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম গত ১০ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের বর্তমান অবস্থা, আর্থিক নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে৷ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা তথ্য, মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন নিয়মিত বিরতিতে তৈরি করা হয়৷

৩০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনের ১৮ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে৷ বড় কোনো কেন্দ্রীভূত ইউনিটের বদলে ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত ‘সেল’ বা শাখার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করার পাশাপাশি তারা নিজস্ব লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে৷ ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় চালানো হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে একিউআইএসের ওপরই বর্তানো হয়েছিল৷ বাংলাদেশে নিজেদের একটি শাখা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে একিউআইএসের তৎপরতা নিয়েও কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে৷

তবে সরকার এই প্রতিবেদনকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ৷ বিষয়টি সরকার আমলে নিচ্ছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার বলেন, তাঁরা এটি আমলে নিচ্ছেন না এবং রিপোর্টটি এখনও পড়েননি৷ পত্রিকার মাধ্যমে যতটুকু জেনেছেন, তাতে তাঁর ধারণা—প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিছকই একটি অনুমাননির্ভর সম্ভাবনা, নিশ্চিত তথ্য নয়৷ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অনুমাননির্ভর কোনো প্রতিবেদনের ওপর তাঁরা নির্ভর করতে পারেন না৷

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই বছরই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কালেমাখচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করতে দেখা গিয়েছিল৷ সেসব মিছিল থেকে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, ইসলামের নবীকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদ কিংবা ইসলামি খেলাফত কায়েমের দাবিও উঠতে শোনা গেছে৷ এরপর বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি বা উগ্রবাদী তৎপরতার একাধিক ঘটনা সামনে আসে৷ গত বছর ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের একটি মিছিল টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল৷

সে সময় পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জঙ্গি বলে বাংলাদেশে আসলে কিছু নেই, যা আছে তা ছিনতাইকারী৷ কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘জঙ্গি’ প্রসঙ্গটি নতুন মাত্রা পায়৷ গত এপ্রিলে সরকারের উচ্চ মহলের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে৷ সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করলেও তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, দেশে জঙ্গি রয়েছে, তবে সরকার সেই সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে৷

মানবাধিকারকর্মী ও জঙ্গিবাদবিষয়ক গবেষক নূর খান লিটন মনে করেন, পাঁচ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিতে পারে উগ্র গোষ্ঠীগুলো৷ তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই—এমনটা বলার আর কোনো সুযোগ নেই৷ কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে যেসব ব্যক্তি পাঁচ আগস্টের পর বেরিয়ে এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল৷ শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, এর বাইরেও যে উগ্রবাদ রয়েছে, তারাও এই সময়টাকে নিজেদের বিচরণের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি৷ পাশাপাশি তিনি এই সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন যে, অতীতে নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোরও উগ্র রূপে ফিরে আসার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে৷

কারামুক্ত কিছু জঙ্গি নেতা ঘিরে বাড়ছে দুশ্চিন্তা

এই আলোচনার মধ্যেই একাধিক কারামুক্ত জঙ্গি নেতার নাম সামনে এসেছে, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন৷ ২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল হক৷ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি অন্তত পাঁচটি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন৷ ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন৷ কিন্তু জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাঁর বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কোনো তথ্য নেই৷ ইকরামুলের বাবা মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের দাবি, জামিনে বের হওয়ার পর তাঁর ছেলে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন৷

পুলিশের ভাষ্যমতে, ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে একিউআইএসের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন৷ ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে সিটিটিসি৷ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিতে দক্ষ এই ব্যক্তি একিউআইএসের দাওয়াহ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং অনলাইনে সদস্যদের ক্লাসও নিতেন৷ কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ইকরামুলের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নাও হতে পারে৷

সূত্র অনুযায়ী, নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ‘বোমারু মামুন’ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পান৷ ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তাঁর তৈরি বোমা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে পুলিশের খাতায়৷ সেই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হয়েছিলেন৷ চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামুনসহ হোটেল ওলিও মামলার সব আসামিকে খালাস দেন আদালত৷ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত কেরাণীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তাঁর সহযোগী আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে৷

গত ১১ আগস্ট আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তাঁর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ১৩টি পাইপবোমা ও বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধারের দাবি করেছে সিটিটিসি৷ সংস্থাটি জানিয়েছে, বোমারু মামুনকে ধরতে জোরালো অভিযান চলছে৷ এর কিছুদিন পর, ১৬ আগস্ট ডেমরা এলাকা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তুসহ জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ নামের আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ পুলিশের তথ্যমতে, জুয়েল ২০২৩ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন, পরে ২০২৪ সালে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান৷

৬৯০ বন্দির এখনও খোঁজ নেই

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৬৯০ বন্দির এখনো কোনো হদিস মেলেনি৷ পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন৷ কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, এই ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকি তিন জনের এখনও কোনো খোঁজ নেই৷

মঙ্গলবার তিনি বলেন, কারাগারে নিরাপত্তা ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে৷ তবে ঠিক কতজন জঙ্গি সুনির্দিষ্টভাবে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি৷ এর আগে দুপুরে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, অস্থিরতার সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট দুই হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশকেই ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ তিনি আরও জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৬৬ বন্দির পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি, কারণ হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় সার্ভার ও ডাটাবেজসহ কারাগারের যাবতীয় নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল৷ তাঁর ভাষ্যে, কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪৪ হাজার হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার—যা স্বাভাবিক পরিস্থিতি সামলানোর সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি৷

বিভিন্ন সূত্র থেকে আরও জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ২০ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে ৯ জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের ‘সহযোদ্ধারা’৷ এই ৯ জনের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে৷ সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত জেলখানা থেকে পালানো ৯৮ জঙ্গির মধ্যে ৭০ জনই সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে ২৭ জনকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি৷

সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট—একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে সতর্কবার্তা লঘু করে দেখানোর প্রবণতা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে একের পর এক বোমা উদ্ধার, কারামুক্ত সন্দেহভাজনদের হদিসহীনতা আর আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা—এই সবকিছু মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ৷ আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর৷

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

রাইসা-লাবণ চ্যাম্পিয়ন, ১০ স্বল্পদৈর্ঘ্যে নতুন শিল্পীদের অভিষেক

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

খেলাপির শীর্ষে জনতা, সরকারি ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই কি নিরাপদ?

১৯ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

পাঁচ আগস্টের পর ফিরছে জঙ্গি আতঙ্ক, নজরে আল-কায়েদা

আপডেট সময় ০৮:১১:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

গত এক বছরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ইস্যুটি একরকম নীরবে ফিরে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে৷ পাঁচ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সেই ফাঁকফোকর গলিয়েই সংগঠিত হওয়ার সুযোগ খুঁজে নিচ্ছে উগ্রপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী৷ সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের অনেকের এখনও হদিস না মেলা, আর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে অস্বস্তি৷

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলছেন, পাঁচ আগস্টের পর ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে, এটা অস্বীকারের উপায় নেই৷ তাঁর ভাষায়, কারাগার থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে, তাদের কেউ পথ পাল্টাতে উদ্বুদ্ধ করেনি৷ ফলে যে আদর্শ নিয়ে তারা ছিল, সেই আদর্শ নিয়েই রয়ে গেছে৷ সুযোগ পেলে তারা যে সক্রিয় হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলেই মনে করেন তিনি৷ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তাঁর এই আশঙ্কাকেই যেন সত্যি প্রমাণ করছে৷

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে পরপর কয়েকটি বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর সামনে এসেছে৷ গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি তিনতলা বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট৷ সেখান থেকে একটি সন্দেহভাজন প্রেশার কুকার বা ‘কেটলি বোমা’ এবং বিপুল পরিমাণ গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির নানা উপকরণ জব্দ করা হয়৷

এর আগে ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে রাখা একটি ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ৷ আরও কিছুদিন আগে, ২৪ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে লুকানো অবস্থায় মেলে আরেকটি বোমা৷ এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ঢাকার কেরাণীগঞ্জের একটি মাদ্রাসা এবং শরিয়তপুরের জাজিরায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল৷ কেরাণীগঞ্জের সেই মাদ্রাসা বিস্ফোরণে জঙ্গিবাদ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে, যার প্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চালাচ্ছে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট৷

এসব ঘটনার মধ্যেই কিছুদিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করে বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর৷ পরিস্থিতি নিয়ে সিটিটিসির প্রধান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে তাঁরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং জামিনে বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে৷

হঠাৎ আলোচনায় আল-কায়েদা

এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস৷ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম গত ১০ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের বর্তমান অবস্থা, আর্থিক নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে৷ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা তথ্য, মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন নিয়মিত বিরতিতে তৈরি করা হয়৷

৩০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনের ১৮ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে৷ বড় কোনো কেন্দ্রীভূত ইউনিটের বদলে ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত ‘সেল’ বা শাখার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করার পাশাপাশি তারা নিজস্ব লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে৷ ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় চালানো হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে একিউআইএসের ওপরই বর্তানো হয়েছিল৷ বাংলাদেশে নিজেদের একটি শাখা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে একিউআইএসের তৎপরতা নিয়েও কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে৷

তবে সরকার এই প্রতিবেদনকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ৷ বিষয়টি সরকার আমলে নিচ্ছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার বলেন, তাঁরা এটি আমলে নিচ্ছেন না এবং রিপোর্টটি এখনও পড়েননি৷ পত্রিকার মাধ্যমে যতটুকু জেনেছেন, তাতে তাঁর ধারণা—প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিছকই একটি অনুমাননির্ভর সম্ভাবনা, নিশ্চিত তথ্য নয়৷ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অনুমাননির্ভর কোনো প্রতিবেদনের ওপর তাঁরা নির্ভর করতে পারেন না৷

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই বছরই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কালেমাখচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করতে দেখা গিয়েছিল৷ সেসব মিছিল থেকে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, ইসলামের নবীকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদ কিংবা ইসলামি খেলাফত কায়েমের দাবিও উঠতে শোনা গেছে৷ এরপর বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি বা উগ্রবাদী তৎপরতার একাধিক ঘটনা সামনে আসে৷ গত বছর ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের একটি মিছিল টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল৷

সে সময় পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জঙ্গি বলে বাংলাদেশে আসলে কিছু নেই, যা আছে তা ছিনতাইকারী৷ কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘জঙ্গি’ প্রসঙ্গটি নতুন মাত্রা পায়৷ গত এপ্রিলে সরকারের উচ্চ মহলের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে৷ সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করলেও তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, দেশে জঙ্গি রয়েছে, তবে সরকার সেই সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে৷

মানবাধিকারকর্মী ও জঙ্গিবাদবিষয়ক গবেষক নূর খান লিটন মনে করেন, পাঁচ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিতে পারে উগ্র গোষ্ঠীগুলো৷ তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই—এমনটা বলার আর কোনো সুযোগ নেই৷ কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে যেসব ব্যক্তি পাঁচ আগস্টের পর বেরিয়ে এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল৷ শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, এর বাইরেও যে উগ্রবাদ রয়েছে, তারাও এই সময়টাকে নিজেদের বিচরণের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি৷ পাশাপাশি তিনি এই সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন যে, অতীতে নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোরও উগ্র রূপে ফিরে আসার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে৷

কারামুক্ত কিছু জঙ্গি নেতা ঘিরে বাড়ছে দুশ্চিন্তা

এই আলোচনার মধ্যেই একাধিক কারামুক্ত জঙ্গি নেতার নাম সামনে এসেছে, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন৷ ২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল হক৷ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি অন্তত পাঁচটি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন৷ ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন৷ কিন্তু জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাঁর বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কোনো তথ্য নেই৷ ইকরামুলের বাবা মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের দাবি, জামিনে বের হওয়ার পর তাঁর ছেলে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন৷

পুলিশের ভাষ্যমতে, ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে একিউআইএসের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন৷ ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে সিটিটিসি৷ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিতে দক্ষ এই ব্যক্তি একিউআইএসের দাওয়াহ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং অনলাইনে সদস্যদের ক্লাসও নিতেন৷ কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ইকরামুলের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নাও হতে পারে৷

সূত্র অনুযায়ী, নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ‘বোমারু মামুন’ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পান৷ ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তাঁর তৈরি বোমা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে পুলিশের খাতায়৷ সেই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হয়েছিলেন৷ চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামুনসহ হোটেল ওলিও মামলার সব আসামিকে খালাস দেন আদালত৷ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত কেরাণীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তাঁর সহযোগী আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে৷

গত ১১ আগস্ট আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তাঁর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ১৩টি পাইপবোমা ও বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধারের দাবি করেছে সিটিটিসি৷ সংস্থাটি জানিয়েছে, বোমারু মামুনকে ধরতে জোরালো অভিযান চলছে৷ এর কিছুদিন পর, ১৬ আগস্ট ডেমরা এলাকা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তুসহ জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ নামের আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ পুলিশের তথ্যমতে, জুয়েল ২০২৩ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন, পরে ২০২৪ সালে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান৷

৬৯০ বন্দির এখনও খোঁজ নেই

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৬৯০ বন্দির এখনো কোনো হদিস মেলেনি৷ পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন৷ কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, এই ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকি তিন জনের এখনও কোনো খোঁজ নেই৷

মঙ্গলবার তিনি বলেন, কারাগারে নিরাপত্তা ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে৷ তবে ঠিক কতজন জঙ্গি সুনির্দিষ্টভাবে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি৷ এর আগে দুপুরে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, অস্থিরতার সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট দুই হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশকেই ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ তিনি আরও জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৬৬ বন্দির পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি, কারণ হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় সার্ভার ও ডাটাবেজসহ কারাগারের যাবতীয় নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল৷ তাঁর ভাষ্যে, কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪৪ হাজার হলেও বর্তমানে বন্দি রয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার—যা স্বাভাবিক পরিস্থিতি সামলানোর সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি৷

বিভিন্ন সূত্র থেকে আরও জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ২০ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে ৯ জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের ‘সহযোদ্ধারা’৷ এই ৯ জনের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে৷ সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত জেলখানা থেকে পালানো ৯৮ জঙ্গির মধ্যে ৭০ জনই সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে ২৭ জনকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি৷

সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট—একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে সতর্কবার্তা লঘু করে দেখানোর প্রবণতা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে একের পর এক বোমা উদ্ধার, কারামুক্ত সন্দেহভাজনদের হদিসহীনতা আর আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা—এই সবকিছু মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ৷ আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর৷

Share this news as a Photo Card