শিরোনাম :
মঙ্গলবার রাত থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ ফিরবে আগের অবস্থায়: প্রধানমন্ত্রী উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ হত্যাচেষ্টা মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভিশন তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৬১ জন ব্রিকসে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ডাক চীন, রাশিয়া ও ভারতের সান্তাহার বাফার গুদামে আবর্জনাসহ সার রিব্যাগিং, সরবরাহে ওজনে ও কম আসিফ মাহমুদের পর্তুগাল-সুইজারল্যান্ডসহ ৫ দেশে হাজার কোটি টাকা পাচার পাকিস্তান থেকে সরে ভারতের দিকে ঝুঁকছে চীন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। এই লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যেখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নিয়ে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।

সরকারি হিসাব বলছে, মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পাঁচ হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে ছাদ থেকে, আর বাকি সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট আসবে ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে। ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ জোগাতে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যার দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিটে সাড়ে দশ টাকা।

গত পহেলা সেপ্টেম্বর জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যেসব গ্রাহক ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে চাহিদার অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট দশ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনা হবে। শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে যেসব গ্রাহক ছাদভিত্তিক সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে তিন বছর মেয়াদে এই বিদ্যুৎ কেনা হবে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতির আওতায় বিতরণ সংস্থাগুলো এই বিদ্যুতের হিসাব সংরক্ষণ করবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর গ্রাহকদের প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করা হবে।

তবে সরকারি-বেসরকারি আবাসিক ও শিল্প খাতের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা।

নিজের চাহিদাই যেখানে অপূর্ণ, বিক্রি হবে কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প কারখানা কিংবা ঢাকার আবাসিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ভবনের পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। ফলে নিজের চাহিদা পূরণই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করার সুযোগ কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমালোচনা— অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেও মাত্র তিন বছরের জন্য তা কিনে নেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি খুব একটা আকর্ষণীয় নয়।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, প্রণোদনা কাঠামোয় এখনও অনেক কিছুই অস্পষ্ট, যা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সাড়ে ১০ টাকা দরে কেনার যে বিষয়টা আছে, আসলে বিক্রিটা কে করবে? স্পষ্ট চিত্র কিন্তু নেই। কারণ, বাসায় যদি দুই কিলোওয়াট লোড থাকে, অর্থাৎ অনুমোদিত লোড দুই কিলোওয়াটই হয়, তা হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পেলেন কোথায় আর বেচবেনই বা কোথায়? এখানে স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন ছিল।”

প্রযুক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, ছাদে প্রতি কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৭০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ কোনো বাড়িতে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল বসাতে হলে প্রায় ৭০০ বর্গফুট জায়গা লাগবে। বর্তমানে ঢাকার বেশিরভাগ আবাসিক ভবনের কাঠামো বিবেচনায় এই প্রণোদনা থেকে বাস্তবে কতটা সুফল আসবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোস্তফা আল মাহমুদ আরও বলেন, “একটা বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার থাকেন, বিভিন্ন ফ্ল্যাটের মালিকও আলাদা। এই ছাদ ব্যবহার করে কারও পক্ষে এককভাবে লাভবান হওয়া প্রায় অসম্ভব। ব্যবহারের জায়গার হিসাবই এখানে অনেক বেশি জটিল। ঢাকার মতো বহুতল ভবন এলাকায় যদি অনগ্রিড ব্যবস্থায় রপ্তানি হওয়া বিদ্যুৎ ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে ভাগাভাগি করা যায়, তবেই একটা উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু ব্যাটারিসহ বিনিয়োগ করলে সেখানে লাভের সুযোগ প্রায় থাকবেই না।”

উৎপাদন খরচ কেমন পড়বে

সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের প্রধান অংশ হলো এককালীন বিনিয়োগ। বর্তমান বাজারে থাকা সোলার প্যানেলগুলো সাধারণত ২০ বছর মেয়াদে ব্যবহারযোগ্য বলে ধরা হয়। তবে ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করলে সামগ্রিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তিন কিলোওয়াট সক্ষমতার একটি ব্যবস্থা মাসে প্রায় ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই হিসাবে একজন আবাসিক গ্রাহকের তিন কিলোওয়াট সক্ষমতার সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসাতে আনুমানিক এক লাখ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করলে আরও প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে দুই লাখ ৭৫ হাজার থেকে তিন লাখ টাকার মতো।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী দীর্ঘদিন ধরে সৌর বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আবাসিক গ্রাহকদের ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথাযথভাবে উৎসাহিত করা গেলে দিনের বেলার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সাধারণ গ্রাহক আদৌ করতে রাজি হবেন কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “সরকার চাইছে একই সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ ও রুফটপ সোলার থাকতে হবে, যাতে গ্রিডে যাওয়া বিদ্যুৎ স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু এর অর্থ হলো ব্যাটারির জন্যও বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে যাবে। সরকার নেট মিটারিং থেকে নেট বিলিং পদ্ধতিতে যেতে চাইছে। কিন্তু বরং ফিড ইন ট্যারিফ পদ্ধতিতে যাওয়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত হতো। তা না হলে বিনিয়োগ আর প্রাপ্তির হিসাব ঠিকমতো মেলে না।”

হাসান মেহেদীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার সাড়ে ১০ টাকা দরে গ্রাহকের উৎপাদিত সোলার বিদ্যুৎ কিনবে ঠিকই, কিন্তু ওই একই গ্রাহক যখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং তার ব্যবহার যদি উচ্চ স্ল্যাবে গিয়ে দশ টাকার বেশি দরে পড়ে, তখন তাকে সেই বাড়তি দামেই বিদ্যুৎ কিনতে হবে। ফলে ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য রুফটপ সোলার থেকে প্রকৃত অর্থে লাভবান হওয়ার সুযোগ সীমিত থেকে যায়।

তিনি আরও বলেন, “রুফটপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ১৩ থেকে ১৪ টাকায়। সেক্ষেত্রে সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি করাটা একটি ছোট পরিবারের জন্য লাভজনক হবে না। বড় কারখানার ক্ষেত্রে সোলারের প্রকৃত ট্যারিফ ১৪ থেকে ১৫ টাকার মতো। সাড়ে ১০ টাকার পরিবর্তে যদি গ্রাহক যে দামে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়া হতো, তাহলে সেটি অনেক বেশি কার্যকর হতো।”

পোশাক খাতে সম্ভাবনা, তবে অর্থায়নই বড় বাধা

বাংলাদেশে একদিকে চলমান বিদ্যুৎ সংকট, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের শর্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে পোশাক কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কারখানা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে এবং তাতে বিদ্যুৎ বিলে কিছুটা সাশ্রয়ও করতে পারছে। তবে কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বেশিরভাগ কারখানার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে সম্মিলিতভাবে এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এনার্জি অপটিমাইজেশন বিভাগের চেয়ারম্যান নিশাত নাহরিন হামিদ জানান, তাদের মূল সমস্যা সৌর বিদ্যুৎ খাতে অর্থায়নের জটিলতা নিয়ে। তিনি বলেন, “আমরা যে জরিপ করেছি, তাতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫৩টি কারখানা সোলার রুফটপ স্থাপনে আগ্রহী। এসব কারখানার সম্মিলিত সক্ষমতা দাঁড়াবে ১৬৫ থেকে ১৭০ মেগাওয়াটের মতো। মূল সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ পাওয়া নিয়ে। কারখানাগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে ছাড়যুক্ত সুদের ঋণ কিংবা অনুদান।”

ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদীর মতে, ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সোলার প্যানেলসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা এবং সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি প্রণোদনা আরও আকর্ষণীয় করা প্রয়োজন। তিনি সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট করণীয় তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচ শতাংশের নিচে সুদে ঋণ সরবরাহ করা এবং প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা। দ্বিতীয়ত, এই অর্থায়ন হতে হবে প্রি-ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে, রি-ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে নয়— কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় গ্রাহককে আগে পুরো বিনিয়োগ করতে হয় এবং পরে ব্যাংক তা লাভজনক মনে করলেই কেবল অর্থ ছাড় করে। তৃতীয়ত, এই খাতে বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষায়িত তহবিল গঠন প্রয়োজন। চতুর্থত, দেশীয় ব্যাংকগুলো সোলার খাতে বিনিয়োগে যেন কোনো বাড়তি সুদ আরোপ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। আর সবশেষে, ফিড ইন ট্যারিফ পদ্ধতি চালু করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

হাসান মেহেদী বলেন, “একটি স্মার্ট বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তা না হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, কে অর্থায়ন করবে এবং সুদের হার কত হবে, তা নিয়ে। এসব বিষয় ঠিকঠাক মতো সমাধান করা গেলে সৌর বিদ্যুতের লক্ষ্যপূরণ নিয়ে আমরা যথেষ্ট আশাবাদী।”

বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া লক্ষ্যপূরণ কঠিন

ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের পাশাপাশি সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ আসবে ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বিশাল লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন হবে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ, যা স্থানীয় উৎস থেকে জোগাড় করা কার্যত অসম্ভব। বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) পদ্ধতিতে গেলে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ পাঁচশ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ১০ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ ও গ্রাউন্ড মাউন্টিং মিলিয়ে হিসাব করলে সামগ্রিক বাস্তবায়নে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার হবে। শুধু স্থানীয় বিনিয়োগ দিয়ে এটি অসম্ভব। আমাদের ব্যাংকগুলোর সেই সক্ষমতাই নেই। ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে, এমন কোনো ব্যাংক আমি দেখি না।”

বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বিনিয়োগের নিশ্চয়তায় ঘাটতি এবং আস্থার সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই আস্থার সংকটের একটি বড় কারণ হলো, বিশেষ আইনের আওতায় সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি সক্ষমতার সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়ে যাওয়া।

২০২৪ সালে বিশেষ আইন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের এসব প্রকল্পও বাতিল করে দেয়, যেগুলোর বেশিরভাগে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও যুক্ত ছিল। ওই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সৌর বিদ্যুতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের ভাষ্য, এরপর নতুন করে বেশ কিছু দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি।

দক্ষ জনবল ও গ্রিড সক্ষমতাও বড় প্রশ্ন

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে জানা গেছে।

এছাড়া বর্তমান গ্রিড সক্ষমতার আওতায় ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের ১০ শতাংশের বেশি জাতীয় গ্রিডে অন্তর্ভুক্ত করার সক্ষমতা নেই। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সামগ্রিক গ্রিড সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এর বাইরে কৃষি জমি সংরক্ষণ করে ভূমিভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সৌর বিদ্যুৎ পরিকল্পনা একদিকে যেমন জ্বালানি সংকট মোকাবিলার একটি সম্ভাবনাময় পথ, তেমনি এর বাস্তবায়নে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ। মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি স্পষ্ট করা, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো গেলেই কেবল ২০৩০ সালের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সুগম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

মঙ্গলবার রাত থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ ফিরবে আগের অবস্থায়: প্রধানমন্ত্রী

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

আপডেট সময় ০২:৩৬:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। এই লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যেখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নিয়ে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।

সরকারি হিসাব বলছে, মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পাঁচ হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে ছাদ থেকে, আর বাকি সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট আসবে ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে। ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ জোগাতে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যার দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিটে সাড়ে দশ টাকা।

গত পহেলা সেপ্টেম্বর জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যেসব গ্রাহক ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে চাহিদার অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট দশ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনা হবে। শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে যেসব গ্রাহক ছাদভিত্তিক সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে তিন বছর মেয়াদে এই বিদ্যুৎ কেনা হবে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতির আওতায় বিতরণ সংস্থাগুলো এই বিদ্যুতের হিসাব সংরক্ষণ করবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর গ্রাহকদের প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করা হবে।

তবে সরকারি-বেসরকারি আবাসিক ও শিল্প খাতের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা।

নিজের চাহিদাই যেখানে অপূর্ণ, বিক্রি হবে কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প কারখানা কিংবা ঢাকার আবাসিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ভবনের পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। ফলে নিজের চাহিদা পূরণই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করার সুযোগ কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমালোচনা— অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেও মাত্র তিন বছরের জন্য তা কিনে নেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি খুব একটা আকর্ষণীয় নয়।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, প্রণোদনা কাঠামোয় এখনও অনেক কিছুই অস্পষ্ট, যা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সাড়ে ১০ টাকা দরে কেনার যে বিষয়টা আছে, আসলে বিক্রিটা কে করবে? স্পষ্ট চিত্র কিন্তু নেই। কারণ, বাসায় যদি দুই কিলোওয়াট লোড থাকে, অর্থাৎ অনুমোদিত লোড দুই কিলোওয়াটই হয়, তা হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পেলেন কোথায় আর বেচবেনই বা কোথায়? এখানে স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন ছিল।”

প্রযুক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, ছাদে প্রতি কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৭০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ কোনো বাড়িতে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল বসাতে হলে প্রায় ৭০০ বর্গফুট জায়গা লাগবে। বর্তমানে ঢাকার বেশিরভাগ আবাসিক ভবনের কাঠামো বিবেচনায় এই প্রণোদনা থেকে বাস্তবে কতটা সুফল আসবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোস্তফা আল মাহমুদ আরও বলেন, “একটা বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার থাকেন, বিভিন্ন ফ্ল্যাটের মালিকও আলাদা। এই ছাদ ব্যবহার করে কারও পক্ষে এককভাবে লাভবান হওয়া প্রায় অসম্ভব। ব্যবহারের জায়গার হিসাবই এখানে অনেক বেশি জটিল। ঢাকার মতো বহুতল ভবন এলাকায় যদি অনগ্রিড ব্যবস্থায় রপ্তানি হওয়া বিদ্যুৎ ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে ভাগাভাগি করা যায়, তবেই একটা উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু ব্যাটারিসহ বিনিয়োগ করলে সেখানে লাভের সুযোগ প্রায় থাকবেই না।”

উৎপাদন খরচ কেমন পড়বে

সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের প্রধান অংশ হলো এককালীন বিনিয়োগ। বর্তমান বাজারে থাকা সোলার প্যানেলগুলো সাধারণত ২০ বছর মেয়াদে ব্যবহারযোগ্য বলে ধরা হয়। তবে ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করলে সামগ্রিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তিন কিলোওয়াট সক্ষমতার একটি ব্যবস্থা মাসে প্রায় ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই হিসাবে একজন আবাসিক গ্রাহকের তিন কিলোওয়াট সক্ষমতার সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসাতে আনুমানিক এক লাখ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করলে আরও প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে দুই লাখ ৭৫ হাজার থেকে তিন লাখ টাকার মতো।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী দীর্ঘদিন ধরে সৌর বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আবাসিক গ্রাহকদের ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথাযথভাবে উৎসাহিত করা গেলে দিনের বেলার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সাধারণ গ্রাহক আদৌ করতে রাজি হবেন কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “সরকার চাইছে একই সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ ও রুফটপ সোলার থাকতে হবে, যাতে গ্রিডে যাওয়া বিদ্যুৎ স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু এর অর্থ হলো ব্যাটারির জন্যও বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে যাবে। সরকার নেট মিটারিং থেকে নেট বিলিং পদ্ধতিতে যেতে চাইছে। কিন্তু বরং ফিড ইন ট্যারিফ পদ্ধতিতে যাওয়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত হতো। তা না হলে বিনিয়োগ আর প্রাপ্তির হিসাব ঠিকমতো মেলে না।”

হাসান মেহেদীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার সাড়ে ১০ টাকা দরে গ্রাহকের উৎপাদিত সোলার বিদ্যুৎ কিনবে ঠিকই, কিন্তু ওই একই গ্রাহক যখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং তার ব্যবহার যদি উচ্চ স্ল্যাবে গিয়ে দশ টাকার বেশি দরে পড়ে, তখন তাকে সেই বাড়তি দামেই বিদ্যুৎ কিনতে হবে। ফলে ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য রুফটপ সোলার থেকে প্রকৃত অর্থে লাভবান হওয়ার সুযোগ সীমিত থেকে যায়।

তিনি আরও বলেন, “রুফটপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ১৩ থেকে ১৪ টাকায়। সেক্ষেত্রে সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি করাটা একটি ছোট পরিবারের জন্য লাভজনক হবে না। বড় কারখানার ক্ষেত্রে সোলারের প্রকৃত ট্যারিফ ১৪ থেকে ১৫ টাকার মতো। সাড়ে ১০ টাকার পরিবর্তে যদি গ্রাহক যে দামে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়া হতো, তাহলে সেটি অনেক বেশি কার্যকর হতো।”

পোশাক খাতে সম্ভাবনা, তবে অর্থায়নই বড় বাধা

বাংলাদেশে একদিকে চলমান বিদ্যুৎ সংকট, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের শর্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে পোশাক কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কারখানা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে এবং তাতে বিদ্যুৎ বিলে কিছুটা সাশ্রয়ও করতে পারছে। তবে কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বেশিরভাগ কারখানার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে সম্মিলিতভাবে এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এনার্জি অপটিমাইজেশন বিভাগের চেয়ারম্যান নিশাত নাহরিন হামিদ জানান, তাদের মূল সমস্যা সৌর বিদ্যুৎ খাতে অর্থায়নের জটিলতা নিয়ে। তিনি বলেন, “আমরা যে জরিপ করেছি, তাতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫৩টি কারখানা সোলার রুফটপ স্থাপনে আগ্রহী। এসব কারখানার সম্মিলিত সক্ষমতা দাঁড়াবে ১৬৫ থেকে ১৭০ মেগাওয়াটের মতো। মূল সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ পাওয়া নিয়ে। কারখানাগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে ছাড়যুক্ত সুদের ঋণ কিংবা অনুদান।”

ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদীর মতে, ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সোলার প্যানেলসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা এবং সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি প্রণোদনা আরও আকর্ষণীয় করা প্রয়োজন। তিনি সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট করণীয় তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচ শতাংশের নিচে সুদে ঋণ সরবরাহ করা এবং প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা। দ্বিতীয়ত, এই অর্থায়ন হতে হবে প্রি-ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে, রি-ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে নয়— কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় গ্রাহককে আগে পুরো বিনিয়োগ করতে হয় এবং পরে ব্যাংক তা লাভজনক মনে করলেই কেবল অর্থ ছাড় করে। তৃতীয়ত, এই খাতে বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষায়িত তহবিল গঠন প্রয়োজন। চতুর্থত, দেশীয় ব্যাংকগুলো সোলার খাতে বিনিয়োগে যেন কোনো বাড়তি সুদ আরোপ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। আর সবশেষে, ফিড ইন ট্যারিফ পদ্ধতি চালু করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

হাসান মেহেদী বলেন, “একটি স্মার্ট বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তা না হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, কে অর্থায়ন করবে এবং সুদের হার কত হবে, তা নিয়ে। এসব বিষয় ঠিকঠাক মতো সমাধান করা গেলে সৌর বিদ্যুতের লক্ষ্যপূরণ নিয়ে আমরা যথেষ্ট আশাবাদী।”

বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া লক্ষ্যপূরণ কঠিন

ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের পাশাপাশি সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ আসবে ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বিশাল লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন হবে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ, যা স্থানীয় উৎস থেকে জোগাড় করা কার্যত অসম্ভব। বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) পদ্ধতিতে গেলে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ পাঁচশ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ১০ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ ও গ্রাউন্ড মাউন্টিং মিলিয়ে হিসাব করলে সামগ্রিক বাস্তবায়নে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার হবে। শুধু স্থানীয় বিনিয়োগ দিয়ে এটি অসম্ভব। আমাদের ব্যাংকগুলোর সেই সক্ষমতাই নেই। ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে, এমন কোনো ব্যাংক আমি দেখি না।”

বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বিনিয়োগের নিশ্চয়তায় ঘাটতি এবং আস্থার সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই আস্থার সংকটের একটি বড় কারণ হলো, বিশেষ আইনের আওতায় সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি সক্ষমতার সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়ে যাওয়া।

২০২৪ সালে বিশেষ আইন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের এসব প্রকল্পও বাতিল করে দেয়, যেগুলোর বেশিরভাগে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও যুক্ত ছিল। ওই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সৌর বিদ্যুতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের ভাষ্য, এরপর নতুন করে বেশ কিছু দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি।

দক্ষ জনবল ও গ্রিড সক্ষমতাও বড় প্রশ্ন

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে জানা গেছে।

এছাড়া বর্তমান গ্রিড সক্ষমতার আওতায় ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের ১০ শতাংশের বেশি জাতীয় গ্রিডে অন্তর্ভুক্ত করার সক্ষমতা নেই। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সামগ্রিক গ্রিড সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এর বাইরে কৃষি জমি সংরক্ষণ করে ভূমিভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সৌর বিদ্যুৎ পরিকল্পনা একদিকে যেমন জ্বালানি সংকট মোকাবিলার একটি সম্ভাবনাময় পথ, তেমনি এর বাস্তবায়নে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ। মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি স্পষ্ট করা, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো গেলেই কেবল ২০৩০ সালের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সুগম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card