স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনে ডেঙ্গুতে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে এবং বাকিরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাসপাতালে মারা যান। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৩০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে গত মাসেই মারা গেছেন ৮০ জন—চলতি বছরের কোনো একক মাসে এটাই সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। একই মাসে সর্বোচ্চ ২২ হাজার ৫২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, তাই মশা নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি বলে মত দিচ্ছেন তাঁরা।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই যেসব লক্ষণ ও সতর্কতা জানা জরুরি
বর্ষা মৌসুম এলেই বাড়ে মশার উপদ্রব, আর তার সঙ্গেই বেড়ে যায় ডেঙ্গু জ্বরের ঝুঁকি। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো এই ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিবছর দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বহু মানুষকে আক্রান্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ জ্বরের মতো মনে হলেও অবহেলা করলে তা গুরুতর রূপ নিতে পারে। তাই লক্ষণ আগেভাগে চেনা এবং যথাযথ সতর্কতা নেওয়াই এই রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
চিকিৎসকদের মতে, মশার কামড়ের চার থেকে দশ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা সাধারণত দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। এই সময় রোগীর শরীরে দেখা দিতে পারে হঠাৎ তীব্র জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও গাঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীরে লালচে র্যাশ এবং গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। মাংসপেশি ও হাড়ের অসহনীয় ব্যথার কারণেই একে অনেক সময় “break-bone fever” বলা হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যাঁরা আগে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, দ্বিতীয়বার সংক্রমণে তাঁদের গুরুতর জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
গুরুতর পর্যায়ে যেসব লক্ষণ বিপজ্জনক
কখনো কখনো জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে পারে — আর এই পর্যায়টিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তীব্র পেটে ব্যথা, বারবার বমি হওয়া, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অস্থিরতা, বমি অথবা পায়খানায় রক্তের উপস্থিতি, ত্বক ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক তেষ্টা পাওয়া — এসবের যেকোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর সেরে যাওয়ার পরের তিন থেকে পাঁচ দিনই আসলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়েই শরীরে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই “জ্বর কমে গেছে মানেই সুস্থ” — এই ধারণা থেকে সরে এসে বরং এই সময়টায় রোগীর ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো উচিত।
প্রতিরোধের মূল উপায়
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো মশার কামড় এড়ানো এবং মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা। যেহেতু এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে সক্রিয় থাকে, তাই এই সময়গুলোতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য শরীর ঢেকে রাখে এমন লম্বা হাতার জামা ও প্যান্ট পরা, মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করা এবং দিনের বেলা ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে। জানালা-দরজায় নেট বা স্ক্রিন লাগিয়ে রাখলেও মশার প্রবেশ অনেকটাই ঠেকানো যায়।
তবে ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা, কারণ এই মশা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। বাড়ির আশপাশে ফুলের টব, ভাঙা বোতল, পুরনো টায়ার বা বালতির মতো পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া, পানির ট্যাংক নিয়মিত ঢেকে রাখা বা সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করা, এবং ছাদ-বারান্দা-নালা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের মশা নিধন কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আক্রান্ত ব্যক্তির যত্নে বাড়তি সতর্কতা
কোনো ব্যক্তি ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে, জ্বর সম্পূর্ণ না কমা পর্যন্ত তাঁকে মশারির নিচে রাখা প্রয়োজন। এতে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে মশা কামড়িয়ে আরও মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা সহজলভ্য টিকা না থাকায়, প্রতিরোধই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান।
আরো যা জানা জরুরী
WHO ও স্বীকৃত মেডিকেল গাইডলাইন অনুযায়ী ডেঙ্গু পজিটিভ হলে করণীয় সবকিছু দেওয়া হলো। এটা তথ্যের জন্য — ডাক্তারের পরামর্শ ও নিয়মিত ব্লাড টেস্ট (বিশেষত প্লাটিলেট ও হেমাটোক্রিট) অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে।
ওষুধ — কী খাবেন, কী এড়াবেন
নিরাপদ:
জ্বর ও ব্যথার জন্য শুধু প্যারাসিটামল (Napa/Ace জাতীয়) — প্রতি ৪-৬ ঘণ্টায় ১০-১৫ মিগ্রা/কেজি, দিনে সর্বোচ্চ ৬০ মিগ্রা/কেজি (lhu)
কখনোই না:
অ্যাসপিরিন বা কোনো NSAID (আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক ইত্যাদি) দেওয়া যাবে না, কারণ অ্যাসপিরিন রক্ত পাতলা করে এবং NSAID প্লাজমা লিকেজ বাড়িয়ে দেয় (mn)
স্টেরয়েডও এড়িয়ে চলতে হবে (lhu)
তরল ও খাবার
প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর তরল পান করতে হবে — ORS (খাবার স্যালাইন), ফলের জুস, ডাবের পানি, বা লবণ দিয়ে পাতলা ভাতের মাড় (lhu)
নরম, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার যেমন আইসক্রিম, দুধ বা ফলের জুস দেওয়া ভালো (who)
কালো বা লাল রঙের খাবার/পানীয় এড়িয়ে চলুন, কারণ পরে বমি হলে বোঝা কঠিন হয়ে যায় সেটা রক্ত কিনা (who)
শুধু সাদা পানি বেশি পান না করাই ভালো, এতে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে — তার বদলে ORS-ই ভালো (who)
প্রতিদিন প্রস্রাব স্বাভাবিক ও পরিষ্কার (হালকা রঙের) হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখুন
যেসব বিপদচিহ্ন দেখলেই সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে হবে
জ্বর কমে যাওয়া সত্ত্বেও অবস্থার অবনতি, খেতে-পান করতে না পারা, বারবার বমি হওয়া, তীব্র পেটে ব্যথা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, রক্তপাত (মাড়ি/নাক দিয়ে), মাথা ঘোরা বা ঝিমিয়ে পড়া, অথবা ৬ ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব না হওয়া — এগুলোর যেকোনো একটা দেখলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যান। (lhu)
এছাড়াও কালো পায়খানা, রক্তবমি, শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা দিলেও তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে যেতে হবে।
বিশেষ সতর্কতা
গর্ভবতী মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, স্থূলকায় ব্যক্তি বা যাদের অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে, তাদের সবসময় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পর্যবেক্ষণে থাকা উচিত (lhu)
একটা সাধারণ ভুল: জ্বর কমে গেলে অনেকে ভাবেন সুস্থ হয়ে গেছে, কিন্তু জ্বর নামার ৩-৫ দিনের মধ্যেই আসলে বিপদচিহ্নগুলো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি — তাই এই সময়টায় বরং আরও বেশি সতর্ক থাকা দরকার (outbreak)
মশা থেকে নিজেকে ঢেকে রাখুন যাতে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে
মনে রাখবেন
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই — চিকিৎসা মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার (উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ)। প্লাটিলেট বাড়ানোর জন্য পেঁপে পাতার রস বা অন্য কোনো “ঘরোয়া টোটকা”র বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, তাই এগুলোর ওপর ভরসা করে ডাক্তারি চিকিৎসা বাদ দেওয়া উচিত নয়।
প্রতিদিন একই সময়ে CBC (প্লাটিলেট, হেমাটোক্রিট) টেস্ট করিয়ে ডাক্তারকে জানাতে থাকুন, বিশেষত জ্বর কমে যাওয়ার পরের দিনগুলোয়।
শেষ কথা
ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে জরুরি। শরীরে জ্বরসহ উপরোক্ত লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখাই এই রোগ থেকে নিরাপদ থাকার প্রধান চাবিকাঠি।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















