সরবরাহ সংকটে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল ছাড়তে একমত হয়েছে জি-৭ জোট। যুক্তরাষ্ট্রও এই জোটের সদস্য। জোটের নেতারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে আসতে শুরু করবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর তিনি জানান, চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি মজুত থেকে ছাড়া হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএর সমন্বয়ে এই কার্যক্রম চলবে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই জি-৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল ছাড়বে। মোট মজুতে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল, দুটোই থাকবে।
হুমকির পটভূমি
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মজুত থেকে আরও জ্বালানি না ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর দামের চাপ কিছুটা কমাতে পারত। কিন্তু এতে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, “ইউরোপ তাদের বিপুল পরিমাণ মজুত ডিজেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হবে।” মার্কিন মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগেই বলেছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পুরো বোঝা যেন মার্কিন কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর না পড়ে।
বৈঠকের পর ম্যাক্রঁ বলেন, সমন্বিত এই উদ্যোগে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের, বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমবে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট ছিলেন।” পরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি “আসলে কখনোই টেবিলে ছিল না”।
যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ দেশগুলো আরও জানিয়েছে, তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও জ্বালানিজাতীয় পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকবে। জোটের সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও প্রতিনিধিত্ব করেছে।
যুক্তরাজ্যের পক্ষে বৈঠকে ছিলেন এড মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করবে, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে এবং পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে রক্ষা করবে।
বাজারে প্রতিক্রিয়া
ঘোষণার পর অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নামে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যায় তা আবার প্রায় ১০২ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার।
কেপলারের কমোডিটি গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার গুজবে দাম আবার বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, “ইউরোপ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার ঘোষণার পর তেলের দাম দ্রুত কমছিল। কিন্তু সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দাম আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এর লক্ষ্য হতে পারে বাব-আল-মান্দেব নৌপথকে নিরাপদ করা।”
ডিজেল কেন গুরুত্বপূর্ণ
পরিবহন ও কৃষিকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে এর দাম বাড়লে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে। পেট্রোলের চেয়ে ডিজেল পরিশোধন বেশি জটিল, আবার চাহিদা দ্রুত কমানোও কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল সরবরাহকারী। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রিফাইনারিতে প্রতিদিন যে জ্বালানি উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে মার্কিনরা ব্যবহার করে প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল। বাকি ১.২ থেকে ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানি হয়।
ডিজেল আমদানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল যুক্তরাজ্যের জন্য মার্কিন রপ্তানি চালু থাকা বড় স্বস্তির খবর। দেশটিতে ব্যবহৃত ডিজেলের অর্ধেকের বেশি আমদানি করা হয়, যার ৩১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। শুক্রবারই প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের পাম্পে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল, উভয়ের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের হামলায় কয়েকটি রিফাইনারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাশিয়া নিজস্ব ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে, ফলে সরবরাহ আরও কমেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন জি-৭ নেতারা।
সরবরাহ বাড়াতে নেতারা রিফাইনারির রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচি সমন্বয় করবেন, যাতে একই সময়ে একাধিক রিফাইনারি বন্ধ না থাকে। অতিরিক্ত পরিশোধন সক্ষমতা আছে এমন দেশগুলোকে ডিজেল উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করা হবে। তবে অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে কারা, কত দ্রুত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়বে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 

















