পাইকারিতে ১৮৫, খুচরায় ৩২০ টাকা: মাল্টার দামে এত ফারাক কেন
রাজধানীতে ফলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার বাবুবাজার-বাদামতলী। গত শনি ও রোববার সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা মাল্টা বিক্রি হয়েছে কেজিতে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায়। ওই দুই দিনই হাতিরপুল, গুলশান, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারের দোকানে একই মাল্টার দাম ছিল ৩২০ থেকে ৩৯০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারির চেয়ে খুচরায় কেজিপ্রতি ১৩৫ থেকে টাকা বেশি।
ব্যবধান শুধু মাল্টায় সীমাবদ্ধ নয়। আমদানি করা আপেল, মাল্টা, আঙুর, কমলা ও আনারের পাইকারি ও খুচরা দর মিলিয়ে দেখা গেছে, এই পাঁচ ফলের পাইকারি গড় দাম কেজিতে ২৯৮ টাকা, খুচরায় ৪৪১ টাকা। হিসাবে খুচরা বাজারে দাম গড়ে ৪৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
শুল্ক-করের চাপ
ফলের দাম নিয়ে এমন সময়ে আলোচনা চলছে, যখন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) গত ২৭ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে ফল আমদানিতে শুল্ক-কর বেশি। হার প্রায় ১২২ শতাংশ। ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে গণ্য করেই এই উচ্চ হার আরোপ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
কমিশনের প্রতিবেদনেও পাইকারি ও খুচরা দামের পার্থক্য উঠে এসেছে। সেখানে কেজিপ্রতি মাল্টার পাইকারি দর ২৭৫ টাকা, খুচরায় ৩৭০ থেকে ৪০০ টাকা।
একদিকে আমদানিতে উচ্চ শুল্ক-কর, অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া; এ দুইয়ের চাপে ফল এখন স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ পুষ্টির জন্য নিয়মিত ফল খাওয়া জরুরি। দেশি ফল বাজারে আছে, তবে চাহিদা মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। শিশুরা সাধারণত আপেল, মাল্টা ও কমলা পছন্দ করে। আবার প্রবীণদের অনেকে শারীরিক সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট কিছু ফল ছাড়া অন্য ফল খেতে পারেন না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ
গত ২১ সেপ্টেম্বর ফলের দাম নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল ‘এখন একটি মাল্টা ১০০ টাকা, একটি ডাব ১৫০-২২০’। এর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ফলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ফলের দাম কমাতে সরকার শুল্ক-কর কমানোর কথা ভাবছে।
বিশ্লেষকদের মত, শুধু শুল্ক-কর কমালেই হবে না। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে, আর শুল্ক কমানোর সুফল যাতে ক্রেতার কাছে পৌঁছায়, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
খুচরায় দাম বেশি কেন
গত রোববার বাদামতলীতে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকার নানা এলাকার খুচরা বিক্রেতারা সেখানে ফল কিনতে জড়ো হয়েছেন। এই বাজার থেকে ফল যায় বিভিন্ন জেলাতেও।
খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, আড়ত থেকে ফল কিনে আনার পর নানা খরচ যোগ করেই তাঁদের দাম ঠিক করতে হয়। কার্টনে ২০ কেজির ফল কিনলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওজনে কম পাওয়া যায়। প্রতি কার্টনে ২০ টাকা কমিশন দিতে হয়। এর সঙ্গে আছে পরিবহন খরচ ও দোকানভাড়া। ফুটপাতের দোকানে দিতে হয় চাঁদাও।
হাতিরপুলের খুচরা বিক্রেতা আজগর হোসেন বলেন, ‘অনেক সময় ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো ফেলে দিতে হয়। আবার পাইকারি বাজার থেকে ২০ কেজি বা ১০ কেজির কার্টন কিনে আনি। কিন্তু দেখা যায় কার্টনে ওই পরিমাণ ফল থাকে না। সব সময় এক-দুই কেজি কম থাকেই। সব মিলিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম একটু বেশি হয়।’
দোকান বেশি, প্রতিযোগিতা কম
রাজধানীর মোড়ে মোড়ে এখন ফলের দোকান, তার ওপর আছে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ব্যবসাটি লাভজনক বলেই দোকানের সংখ্যা এত বেশি। কিন্তু বিক্রেতা বেশি হলেও দাম কম নেই। অনেক দর-কষাকষির পর কখনো কেজিতে ১০ টাকা কমানো যায়। একটি বাজারে ফলের ব্যবসায়ীরা প্রায় একই দাম চান। কেউ কম দামে বিক্রি করলে অন্যরা তাঁর ওপর চড়াও হন, এমন উদাহরণও আছে বলে জানা গেছে।
দাম প্রকাশের প্রস্তাব
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফলের বাজারে প্রকাশ্য স্থানে প্রতিদিনের পাইকারি দরের তালিকা টাঙিয়ে দিলে খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ হবে। কাজটি করতে পারে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নাজিম উদ্দিন বলেন, খুচরা বিক্রেতারা অল্প পণ্যে বেশি লাভ করতে চান। তাঁদের কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাভ করতে হয়। ক্রেতারা পাইকারি ও খুচরা দামের তথ্য জানেন না, এটিও একটি সংকট বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথা, ‘একটি যথাযথ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিনের বাজারদর প্রতিদিন জনগণকে জানার সুযোগ করে দিলে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়া বন্ধ করা সম্ভব।’
চলমান বার্তা ডেস্ক : 






















