শিরোনাম :
আগামী গ্রীষ্মের আগেই সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য: বিদ্যুৎমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে : প্রধানমন্ত্রী এআই যেন বেকারত্ব আরও জটিল না করে, সতর্ক করলেন রাষ্ট্রপতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস হারিয়ে ইরান যুদ্ধের দায় আংশিক মানলেন ট্রাম্প মোংলায় নতুন শিল্পকারখানা গড়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর ‘ফিউচার মেকার্স’ জিতে নিল ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান মারধরের মামলায় পরোয়ানার পর আদালতে আত্মসমর্পণ, পরীমনির জামিন মঞ্জুর শিল্পমালিক ও সাবেক মন্ত্রীরা পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়ন শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় ঢাকা ও আশপাশে মোতায়েন ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মাল্টা পাইকারিতে ১৮৫, খুচরায় ৩৯০ টাকা: দামে এত ফারাক কেন

হাইড্রোজেন ট্রেনের যুগে ভারত

পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগের নতুন এক যুগে পদার্পণ করল ভারত। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দেশটির প্রথম হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলচালিত ট্রেনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জার্মানি, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর কাতারে গিয়ে দাঁড়াল ভারত, রেল যোগাযোগে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে যুক্ত হলো নতুন এক নাম।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তর রেলওয়ের ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ জিন্দ-সোনিপৎ রুটে চলাচল করবে ১০ কোচের এই ট্রেনটি, যা বিশ্বের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানাচ্ছে, প্রথাগত ডিজেল ইঞ্জিনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধারায় চলে এই ট্রেন। কোনো ওভারহেড বৈদ্যুতিক তারের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে অনবোর্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম এটি। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল, যা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করে।

ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত দুটি পাওয়ার কারের উচ্চ-চাপ সিলিন্ডারে বহন করা হয় সংকুচিত হাইড্রোজেন গ্যাস। এই হাইড্রোজেন যখন ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে, তখন একটি প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের সহায়তায় হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রন পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর ইলেকট্রনগুলো একটি বাহ্যিক বৈদ্যুতিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে বাধ্য হলে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ, যা সচল রাখে ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটরকে। একই সময়ে চারপাশের বাতাস থেকে সংগৃহীত অক্সিজেন মিলিত হয় হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রনের সঙ্গে।

এই সম্পূর্ণ তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ঘটে না কোনো দহন, তৈরি হয় না কোনো ধোঁয়া। ফলে ক্ষতিকর কার্বন নির্গমনের বদলে উপজাত হিসেবে নির্গত হয় কেবল জলীয় বাষ্প আর তাপ, যা একে পরিণত করেছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে। ফুয়েল সেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জমা থাকে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে, যা ট্রেন গতি বাড়ানোর সময় বাড়তি শক্তি জোগায় এবং ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরুৎপাদন করে সংরক্ষণ করে রাখে।

শক্তির ঘনত্বের বিচারেও ডিজেলের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে হাইড্রোজেন। ডিজেলের শক্তির ঘনত্ব যেখানে প্রতি কেজিতে ৪৩ মেগাজুল, সেখানে হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১২০ মেগাজুল। ফলে কার্বন নির্গমন ছাড়াই উচ্চ কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে এই প্রযুক্তি।

ট্রেনটিকে সার্বক্ষণিক সচল রাখার লক্ষ্যে হরিয়ানার জিন্দে স্থাপন করা হয়েছে ভারতের বৃহত্তম রেলওয়ে হাইড্রোজেন স্টোরেজ ও রিফুয়েলিং স্টেশন। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা এই কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা সম্ভব প্রায় ৩ হাজার কেজি হাইড্রোজেন, যা তৈরি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনেই।

রিসার্চ, ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশনের কারিগরি নির্দেশনায় নির্মিত এই ১০ কোচের ট্রেনে যাতায়াত করতে পারবেন প্রায় ২ হাজার ৬০০ যাত্রী। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিবেগের উপযোগী করে নকশা করা হলেও, আপাতত সুরক্ষার স্বার্থে ৭৫ কিলোমিটার গতিতেই চালানো হবে এটি।

জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন ও সোনিপতের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই ট্রেনের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হয়নি। এতে সংযুক্ত রয়েছে হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর, ফ্লেম ডিটেকশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোজেন শাট-অফ মেকানিজম এবং চালকদের জন্য রিয়েল-টাইম হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত অর্জনই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের একটি দৃঢ় পদক্ষেপও বটে। আগামী দিনে দেশের অন্যান্য রুটেও এই ধরনের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ট্রেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার এই প্রয়াস ভবিষ্যতে ভারতের রেল খাতের চেহারাই পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

কুড়িগ্রামে জেলা শিল্পী কল্যাণ সোসাইটির যাত্রা শুরু

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

মাল্টা পাইকারিতে ১৮৫, খুচরায় ৩৯০ টাকা: দামে এত ফারাক কেন

০৫ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

হাইড্রোজেন ট্রেনের যুগে ভারত

আপডেট সময় ০৮:১৭:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগের নতুন এক যুগে পদার্পণ করল ভারত। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দেশটির প্রথম হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলচালিত ট্রেনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জার্মানি, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর কাতারে গিয়ে দাঁড়াল ভারত, রেল যোগাযোগে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে যুক্ত হলো নতুন এক নাম।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তর রেলওয়ের ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ জিন্দ-সোনিপৎ রুটে চলাচল করবে ১০ কোচের এই ট্রেনটি, যা বিশ্বের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানাচ্ছে, প্রথাগত ডিজেল ইঞ্জিনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধারায় চলে এই ট্রেন। কোনো ওভারহেড বৈদ্যুতিক তারের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে অনবোর্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম এটি। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল, যা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করে।

ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত দুটি পাওয়ার কারের উচ্চ-চাপ সিলিন্ডারে বহন করা হয় সংকুচিত হাইড্রোজেন গ্যাস। এই হাইড্রোজেন যখন ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে, তখন একটি প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের সহায়তায় হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রন পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর ইলেকট্রনগুলো একটি বাহ্যিক বৈদ্যুতিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে বাধ্য হলে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ, যা সচল রাখে ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটরকে। একই সময়ে চারপাশের বাতাস থেকে সংগৃহীত অক্সিজেন মিলিত হয় হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রনের সঙ্গে।

এই সম্পূর্ণ তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ঘটে না কোনো দহন, তৈরি হয় না কোনো ধোঁয়া। ফলে ক্ষতিকর কার্বন নির্গমনের বদলে উপজাত হিসেবে নির্গত হয় কেবল জলীয় বাষ্প আর তাপ, যা একে পরিণত করেছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে। ফুয়েল সেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জমা থাকে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে, যা ট্রেন গতি বাড়ানোর সময় বাড়তি শক্তি জোগায় এবং ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরুৎপাদন করে সংরক্ষণ করে রাখে।

শক্তির ঘনত্বের বিচারেও ডিজেলের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে হাইড্রোজেন। ডিজেলের শক্তির ঘনত্ব যেখানে প্রতি কেজিতে ৪৩ মেগাজুল, সেখানে হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১২০ মেগাজুল। ফলে কার্বন নির্গমন ছাড়াই উচ্চ কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে এই প্রযুক্তি।

ট্রেনটিকে সার্বক্ষণিক সচল রাখার লক্ষ্যে হরিয়ানার জিন্দে স্থাপন করা হয়েছে ভারতের বৃহত্তম রেলওয়ে হাইড্রোজেন স্টোরেজ ও রিফুয়েলিং স্টেশন। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা এই কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা সম্ভব প্রায় ৩ হাজার কেজি হাইড্রোজেন, যা তৈরি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনেই।

রিসার্চ, ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশনের কারিগরি নির্দেশনায় নির্মিত এই ১০ কোচের ট্রেনে যাতায়াত করতে পারবেন প্রায় ২ হাজার ৬০০ যাত্রী। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিবেগের উপযোগী করে নকশা করা হলেও, আপাতত সুরক্ষার স্বার্থে ৭৫ কিলোমিটার গতিতেই চালানো হবে এটি।

জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন ও সোনিপতের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই ট্রেনের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হয়নি। এতে সংযুক্ত রয়েছে হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর, ফ্লেম ডিটেকশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোজেন শাট-অফ মেকানিজম এবং চালকদের জন্য রিয়েল-টাইম হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত অর্জনই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের একটি দৃঢ় পদক্ষেপও বটে। আগামী দিনে দেশের অন্যান্য রুটেও এই ধরনের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ট্রেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার এই প্রয়াস ভবিষ্যতে ভারতের রেল খাতের চেহারাই পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Share this news as a Photo Card