সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে রাজপথে লংমার্চের বদলে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে তার ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দরকার। সেই আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসতে হবে। লংমার্চ করে এসব বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এক সেমিনার হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
উচ্চকক্ষ নিয়ে যা বললেন
উচ্চকক্ষের ক্ষমতার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আলোচকেরা বলেছেন উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতিতে হলে এর ক্ষমতা, কার্যপরিধি ও এখতিয়ার পরে ঠিক করা যাবে। তবে এ নিয়ে কথা বলতে হলে বিরোধী দলকে কমিটিতে আসতে হবে। যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শিথিল করতে চাইলেও আলোচনা লাগবে। তাঁর ভাষায়, ‘সেটা লং মার্চে হবে না।’
আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তাকে কী কী এখতিয়ার দেওয়া যাবে, সেটিও ঠিক করতে হবে বলে মত দেন তিনি। উচ্চকক্ষ অনির্বাচিত হলে নির্বাচিত সিনেটের মতো ক্ষমতা দেওয়া যাবে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয় বলে উল্লেখ করেন।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি বলেন, আসিফ নজরুল প্রস্তাব দিয়েছেন, তাঁদের গাড়ি, বাড়ি বরাদ্দ ও বেতন-ভাতা না দিলে ভালো হয়। এই প্রস্তাবের সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ একমত।
আইন প্রণয়নের গতি নিয়েও আশঙ্কার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া আইন পর্যালোচনা বা অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে গেলে সেটি কত দিন সেখানে থাকতে পারবে এবং কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তা নির্ধারণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। না হলে সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও অসুবিধা হতে পারে। কোন কোন সংশোধনী উচ্চকক্ষে যাবে এবং কত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ও কত দিনের মধ্যে তা পাস হবে, সেটাও ঠিক করতে হবে বলে জানান তিনি।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, অর্থাৎ বেসিক স্ট্রাকচারের প্রসঙ্গও আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, এটি বিচার বিভাগীয় ধারণা। এর আসল অর্থ কী এবং এ ধরনের কোনো ধারা বা সংশোধনী উচ্চকক্ষে গেলে কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। ‘আমি তো আলোচনা চেয়েছি’—বলেন তিনি।
আদেশ নয়, চাই রাজনৈতিক সমঝোতা
বিরোধীদের সংস্কার-দাবির প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আসিফ নজরুল একটি আদেশ পাস করে দিয়েছিলেন, এখন তা অস্বীকার করা যায় না। তবে আদেশটি পাস না করার জন্য তিনি তখন অনুরোধ করেছিলেন এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। আদেশ দিয়ে সংবিধান স্পর্শ করা যায় কি না, সেটিই প্রশ্ন বলে মত তাঁর।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সংবিধান প্রণীত হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে অনেক কিছু হয়েছিল, যা পরে প্রজ্ঞাপনের আকারে এসেছে। তবু এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সমঝোতার দলিলে সবাই স্বাক্ষর করলে সেটি অঙ্গীকারে পরিণত হয়। যাঁরা সেই অঙ্গীকার ভাঙবেন, পরবর্তী সংসদে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সাধারণত এটাই রাজনৈতিক সমঝোতার রূপ।
তিন জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
তিন জোটের সমঝোতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর অনেক কিছু লঙ্ঘিত হয়েছে বলে বলা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো লিখিত দলিল তাঁরা এখনো পাননি। সমঝোতায় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, সেটি হয়েছে। বৃহত্তর অর্থে রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন নিয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর প্রশ্ন, অন্তর্বর্তী সরকার কেন বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে গেল না, আগের সরকারই বা কেন দেয়নি। তাঁর মতে, এখন বেসরকারি চ্যানেল ও গণমাধ্যম রয়েছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবু ভারসাম্য ও জবাবদিহি বজায় রাখতে সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, এটি মানা হয়নি কেন, সে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমে তাঁরা মানতে চাননি। পরে বিষয়টি জনদাবিতে পরিণত হলে তাঁরাই এই ব্যবস্থা মেনে নেন।
ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা কেবল সাংবিধানিক সংশোধনীতেই সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কেউ ব্যক্তিকে প্রধান বলেছেন, কেউ প্রতিষ্ঠানকে, কেউ আবার আইনকে—এমন নানা মতের কথা উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠান গড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের জবাবদিহি আইনের মাধ্যমে ঠিক করে দিতে হবে। নইলে সেই প্রতিষ্ঠানও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।
বিচার বিভাগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর স্বাধীনতার বিরোধিতা কেউ করছেন না। কিন্তু বিচারকদের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাঁদের জবাবদিহি আছে কি না, সেটিও দেখা দরকার। তিনি ভবিষ্যদ্বাণীর সুরে বলেন, আগামী ২০ বছর পরে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান হবে।
বিচারক নিয়োগ নিয়ে আসিফ নজরুলের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নিজের সবচেয়ে নিম্নমানের ছাত্রটি কীভাবে বিচারক হয়েছেন, তা জানতে চেয়েছেন আসিফ নজরুল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তাঁরা চান এবং তা নিশ্চিত করবেন। তাঁর ভাষ্য, আইন মন্ত্রণালয় কেবল ফাইল পাঠানোর দায়িত্ব পালন করে, বাকি সবকিছু সুপ্রিম কোর্টের হাতে। বিচারকেরা বিচারকাজ পরিচালনায় যথেষ্ট স্বাধীন বলেও মত দেন তিনি।
সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে
রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গের সার্বভৌমত্ব চাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্বের দুটি দিক—জনগণ ও দেশ। জনগণ সরাসরি এই ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভার সদস্যদের পাঠান। তাঁরাই জনগণের হয়ে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তাই বাস্তবিক অর্থে বলা হয়, পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। অন্য অঙ্গগুলো নির্বাচিত নয়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 















