ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সোমবারও রাস্তায় নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়েছে। সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে চলেছে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। অস্থিরতা সামাল দিতে গাজীপুরে মোতায়েন করা হয়েছে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
মহাসড়কে আবারও অবরোধ
সোমবার সকাল থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। এর ফলে মহাসড়কের দুই পাশেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার বাসসহ নানা গন্তব্যের যাত্রী ও চালকেরা আটকা পড়েন তীব্র যানজটে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জট ছড়িয়েছে মহাসড়কের উভয় পাশে অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
সকালে চন্দ্রা ছাড়াও সফিপুর, হরিণহাটিসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সড়কে অবস্থান নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ৮টার আগেই সড়ক অবরোধের বিষয়টি তারা নিশ্চিত করেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটানা চতুর্থ দিনের মতো এই অবরোধ চলছে বলেও জানা গেছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের বক্তব্য, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা মাঠ ছাড়বেন না। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির পাশাপাশি তাঁদের দাবির তালিকায় আছে কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ এবং বিনা নোটিশে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা। শ্রমিকদের অভিযোগ, নানা অজুহাতে কারখানা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছেমতো ছাঁটাই করছে। এর প্রতিবাদ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতেই তাঁরা রাজপথে নেমেছেন।
প্রশাসনের অবস্থান
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আজ থেকে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্প পুলিশ ও জেলা পুলিশও মাঠে আছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও মৌচাক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই তাঁদের কাজ।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, কিছু শ্রমিকের সঙ্গে বহিরাগত লোকজন জড়ো হয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, টিয়ারশেল
সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে সোমবার সকাল থেকে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। বিক্ষোভের মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকেরা হামলা চালিয়েছেন এবং সেখানে ইটপাটকেল ছুড়েছেন। এদিকে আশুলিয়ার শারমিন গ্রুপ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
মিরপুরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকেরা অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ধাওয়া দেয়। শুরু হয় দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। শ্রমিকেরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
এরপর পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, পুলিশ রাস্তায় কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, সন্দেহজনক কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, শ্রমিকেরা রাস্তা অবরোধ করতে এসেছিলেন, তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রোববারের ঘটনা
আন্দোলনের সূত্রপাত গতকাল রোববার। সকাল থেকে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে একযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়। কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও তেলিচালা এলাকায় সড়ক অবরোধের জেরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল থেমে যায়। দিনের একপর্যায়ে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার কয়েকটি কারখানার ফটক এবং মৌচাক ও কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচের পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি কারখানার ঝুটের গুদাম ও পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এক বিবরণে আনসার একাডেমির সামনে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার কথাও এসেছে।
রতনপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও আন্দোলন ছড়ায়। সংঘর্ষে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। নিরাপত্তার কারণে গাজীপুরের প্রায় ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনে বহিরাগতদের অংশগ্রহণ ও উসকানির অভিযোগে রোববার কালিয়াকৈরে অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা ও মহানগর পুলিশ সব মিলিয়ে গ্রেপ্তার করেছে ৩০ জনকে।
মজুরি বোর্ড ও প্রেক্ষাপট
রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পোশাক খাতে মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সেখানে তিনি শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এবং শনিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি।
বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামছুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং নিরপেক্ষ দুই সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও আনোয়ার হোসাইনও বোর্ডে আছেন। বোর্ড সব পদের জন্য ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে গেজেট আকারে প্রকাশ করবে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক খাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা ও কার্যকর হয়। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণ হয়। তবে গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধন বিলে এই মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। সে হিসাবে নভেম্বরেই নতুন বোর্ড ঘোষণার কথা ছিল।
মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানানো হলেও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 















