যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ফলাফলের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ এই পরাজয়ের একটি কারণ। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। একই সময়ে ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা নিয়েও এমন এক ঘোষণা দিয়েছেন তিনি, যা ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিব পর্যন্ত আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভোটের রাতে ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি
গত মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের দুই কক্ষের জন্য ভোট হয়। ভোট শেষের আগেই বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত মিলছিল, রিপাবলিকানদের জন্য রাতটি সহজ হবে না। সেই রাতেই টেলিফোনে এক মার্কিন সংবাদপত্রকে সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধও এর একটি কারণ।
এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে বলেছিলেন, এই যুদ্ধের কারণেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে। যুদ্ধ আদৌ সার্থক ছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি। পরে ট্রাম্পের কথায় সেই সুরেরই আংশিক প্রতিধ্বনি শোনা গেল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ভবিষ্যৎ
ফলাফলের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইরানে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া হবে কি না, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের উত্তর ছিল, না, তাঁর মনে হয় হেগসেথ খুব ভালো কাজ করছেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরও জানিয়েছে, ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত পেন্টাগনের নেতৃত্বে থাকতে হেগসেথ পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, যুদ্ধের জন্য কাউকে না কাউকে দায় নিতে হবে এবং হেগসেথের বরখাস্তের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। নিজের দলের ভেতরেও সমালোচনা আছে। সিনেটর টম টিলিস বলেছেন, হেগসেথকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর মতে, আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েন কংগ্রেসে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিল পাসের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ বছরের শুরুতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে অভিযান চালানোর অভিযোগে হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাবও এনেছিলেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য টমাস ম্যাসি।
ইতিহাসে এর একটি নজির আছে। ২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারায়। ভোটের পরদিনই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেন। ট্রাম্প এবার সেই পথে হাঁটেননি। তবে হোয়াইট হাউস বলছে, হেগসেথ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য বক্তব্যই দেখে নিতে হবে।
শুধু যুদ্ধ নয়, হারের পেছনে আরও কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, পরাজয়ের ব্যাখ্যা কেবল ইরান যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে আরও চারটি কারণ উঠে এসেছে।
১. জীবনযাত্রার ব্যয়। দেশজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অক্টোবরের শুরুতে খুচরা পর্যায়ে ডিজেলের গড় দাম পৌঁছায় গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ ডলার ৫২ সেন্টে, যা রেকর্ড। ভোটারদের এক জরিপে ৭৯ শতাংশ জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁরা বা তাঁদের পরিবার গুরুতর কিংবা মাঝারি আর্থিক চাপে পড়েছেন। ছয়জনেরও বেশি উত্তরদাতা এর জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।
২. ডেমোক্র্যাটদের গোছানো প্রচার। জীবনযাত্রার ব্যয় আর স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্রে রেখে ধারাবাহিক বার্তা দিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। সাউথ ক্যারোলাইনায় চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ অপ্রত্যাশিত বড় জয় পেয়েছেন। মিশিগানে আসন ধরে রেখেছেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদ। জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত সিনেটর জন অসফ ৩৯ বছর বয়সে এমন রাজ্যে সহজ জয় পেয়েছেন, যেখানে আগে দুবার জিতেছিলেন ট্রাম্প। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা জোরালো হতে পারে। অন্যদিকে টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী দুর্বল প্রচারের জন্য সমালোচিত হয়েছেন। ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ভালো করেছে।
৩. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমা। পণ্যের দাম ও ইরান যুদ্ধ, এই দুই বিষয়ে ভোটারদের অসন্তোষ সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমে। সমর্থকদের চাঙ্গা করতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভোটাররা যেন ভাবেন তিনি নিজেই প্রার্থী। কিন্তু সেই কৌশল কাজে আসেনি বলেই মনে হচ্ছে।
৪. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সরে যাওয়া। দুই বছর আগে এই দুই জনগোষ্ঠীর একাংশ রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিল। এবার প্রবণতা উল্টে গেছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনটি আসনে জিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। অভিবাসনবিরোধী অভিযান নিয়ে ক্ষোভও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। একটি জরিপে ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কথা জানিয়েছেন।
নির্বাচনের দিনে ইসরায়েল নিয়ে ঘোষণা
ভোটের দিনই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেকটি বিষয়ে মুখ খোলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, চলতি বছরের শেষে ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ হবে। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়েছে এবং ইসরায়েলের এখন আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই। তবে অস্ত্র বিক্রি চলবে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহায়তা ডেমোক্র্যাটদের হাতে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। সে প্রসঙ্গে মিশিগানের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটরের নাম করে তাঁকে ‘উন্মাদ’ বলেন ট্রাম্প। এর পটভূমিতে আছে জনমতের পরিবর্তন। এক জরিপে ৪৮ শতাংশ ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে। ২০১৭ সালে একই প্রশ্নে এই হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ।
বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়। ২০১৬ সালের একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ইসরায়েলকে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি আছে। এর মধ্যে বছরে ৩৩০ কোটি ডলার সামরিক অর্থায়ন এবং ৫০ কোটি ডলার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য। এটি নগদ অর্থ নয়। ইসরায়েল এই অর্থে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম, সেবা ও প্রশিক্ষণ কেনে, ফলে সুবিধা পায় মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পও। প্রতিবছর এই তহবিলের বরাদ্দ ঠিক করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তাই কেবল ঘোষণায় সহায়তা বন্ধ হওয়ার কথা নয়। ট্রাম্প বাস্তবায়নের বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইসরায়েলের ভেতরে প্রতিক্রিয়া কড়া। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট বলেছেন, সম্পর্কের কাঠামো বদলের খবর জনগণ জানছে সংবাদমাধ্যম থেকে, নেতানিয়াহুকে আর ভরসা করা যায় না। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান একে নেতানিয়াহুর আরেকটি বড় ব্যর্থতা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, দুই বছরের সহায়তা ছাড়লে ৮০০ কোটি ডলার হারাবে দেশটি। উল্লেখ্য, নেতানিয়াহু এর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি আগামী দশকে ধাপে ধাপে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে চান। কিন্তু হঠাৎ সহায়তা বন্ধ হলে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হবে।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে কঠিন পথ
কংগ্রেসের দুই কক্ষ হাতে পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয়, অভিবাসন নীতি ও ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। তবে ক্ষমতা মানেই সব ঠিক করে ফেলা নয়। ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা আছে, আর তা অতিক্রম করতে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে।
বিশ্লেষকেরা আরও কয়েকটি পরীক্ষার কথা বলছেন। ভোটারদের প্রত্যাশা, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে, মেটানো একটি। দলের ভেতরে মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীলদের মতপার্থক্য সামলানো আরেকটি। প্রতিনিধি পরিষদে হাকিম জেফরিস স্পিকার নির্বাচিত হলে সেই দায়িত্ব তাঁর ওপরই বেশি পড়বে। তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখাও জরুরি, কারণ ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব থেকে পাওয়া ভোট স্থায়ী সমর্থন নাও হতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের জয় ২০২৮ সালের ফলের নিশ্চয়তাও দেয় না।
বর্তমান কংগ্রেসের মেয়াদ বাকি আছে আর মাত্র ৬০ দিন। এই সময়ে হেগসেথের ভবিষ্যৎ, ইসরায়েল নিয়ে ঘোষণার বাস্তবায়ন এবং রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর্যালোচনা, সবই নজরে থাকবে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 



















