রাজধানীর বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, আর তার সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসারে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে সবজি, মাছ ও ডিম—দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সীমিত আয়ে সংসার চালানো এখন অনেকের কাছে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে গেলেই আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের, অথচ আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি বললেই চলে।
শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বহু পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষত নিম্নবিত্ত পরিবার এবং দিনমজুরদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে একের পর এক পণ্য বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ক্রেতাদের অভিযোগ, একই পরিমাণ অর্থ খরচ করেও এখন আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য ঘরে তুলতে পারছেন তারা। দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
রিকশাচালক, দিনমজুর ও ছোট ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে উঠে এসেছে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা। প্রতিদিনের সীমিত আয়ে পরিবারের খাবার জোগাড়, বাসাভাড়া পরিশোধ, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন, কেউ কেউ আবার ধারদেনার আশ্রয় নিয়ে কোনোরকমে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছেন।
সপ্তাহের ব্যবধানে বাড়ল মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনে দেখা যায়, আগের সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে। ব্যতিক্রম কেবল গরুর মাংস—যার দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
মাছের বাজারেও একই চিত্র। সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে, আর খাসির মাংস কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। ডজনপ্রতি ডিমের দাম দাঁড়িয়েছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। তবে সোনালি, হাইব্রিড ও লেয়ার জাতের মুরগির দামে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি—সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা এবং লেয়ার ৩৫০ টাকা কেজি দরে।
পুকুরে চাষ করা মাছের মধ্যে পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতল, মৃগেল ও পোয়া মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। জীবিত পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৩০ টাকায়, তেলাপিয়া ২৬০ টাকায়। মানভেদে চিংড়ির দাম উঠেছে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। পাবদা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং ট্যাংরা মাছ ৭০০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া ভেটকি মাছের দাম ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং চাষের কই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজি দরে। পোয়া মাছ ২৬০ টাকা এবং শোল মাছের দাম উঠেছে ৭০০ টাকা কেজিতে।
আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং মাঝারি আকারের রুই মাছ কিনতে ক্রেতাদের খরচ করতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তবে রূপচাঁদা, শোল কিংবা নদীর বেলে মাছের মতো তুলনামূলক দামি প্রজাতি কিনতে গেলে হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বৃষ্টি ও বন্যায় সরবরাহ সংকট, বাড়তি চাপ সবজির বাজারে
বিক্রেতাদের ভাষ্যমতে, টানা বৃষ্টিপাত এবং বন্যার প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আগের মতো পর্যাপ্ত সবজি রাজধানীতে আসছে না। ফলে পাইকারি পর্যায়েই সবজির দাম বেড়ে গেছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে খুচরা বাজারেও। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিকট ভবিষ্যতে বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই সবচেয়ে বড় আঘাত
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে কঠিন আঘাতটি এসে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের মোট আয়ের বড় একটি অংশই ব্যয় হয় খাদ্যপণ্য কেনার পেছনে। ফলে খাদ্যপণ্যের দামে সামান্য পরিবর্তন হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ে বহুগুণ বেশি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা বাজার তদারকি আরও জোরদার করা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হারে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতার আভাস মিললেও খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম এখনো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে। ফলে পরিসংখ্যানে স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রায় তার ইতিবাচক ছাপ এখনো স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে না।
সবমিলিয়ে, বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে যে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে, তা থেকে মুক্তি পেতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিরোনাম :
নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোয়া : বিপর্যস্ত নিম্ন আয়ের জীবনযাত্রা
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১২:৩৭:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- 5
জনপ্রিয় সংবাদ





















