আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল থাকায় জাতিসংঘ তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্যবহৃত প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য প্রকাশ করেনি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের এক আইনজীবী। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলার শুনানি শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।
জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় আজ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই মামলার প্রধান আসামি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তাঁর সঙ্গে আরও ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। যুক্তিতর্কের এক পর্যায়ে প্রসিকিউটর মোনাওয়ার হুসাইন বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের নির্দেশে সশস্ত্র ছাত্র ও দলীয় কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এই তথ্য জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বলে তিনি আদালতকে জানান।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে সব সাক্ষীর তথ্যসূত্র উল্লেখ থাকলেও সংস্থাটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে, আইন থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা হলেই কেবল তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের পরিচয় ও তথ্য হস্তান্তর করবে। এই শর্তের কারণে রাষ্ট্রপক্ষ জাতিসংঘের কাছ থেকে সরাসরি কোনো সাক্ষী পায়নি। তবে নিজস্ব উদ্যোগে সংগ্রহ করা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় একটি পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনে ওই সময়কার নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সরাসরি দায়ী করা হয়।
প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী দল রাজধানী ছাড়াও চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, সিলেট ও গাজীপুরসহ মোট আটটি শহরে সরেজমিন তদন্ত চালিয়েছিল। এই তদন্তের অংশ হিসেবে অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের নিয়ে দুই শতাধিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে আরও কয়েক ডজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যাঁরা সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সরাসরি অবগত ছিলেন।
প্রসিকিউটর মোনাওয়ার হুসাইন জানান, বিশ্বব্যাপী যেকোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড রহিতের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরেই অবস্থান নিয়ে আসছে জাতিসংঘ। সেই নীতিগত অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা অবস্থায় তারা সংবেদনশীল সাক্ষীদের পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহী।
আজকের শুনানিতে আলোচিত মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবসংগঠনের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলার সাতজন আসামির প্রত্যেকেই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন এবং তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান এই মামলাটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পরবর্তী ধাপে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিরোনাম :
মৃত্যুদণ্ড না তোলায় সাক্ষীর তথ্য দিল না জাতিসংঘ
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৬:৩৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
- 12
জনপ্রিয় সংবাদ



























