দিল্লির রাজপথে আজ যা ঘটছে, তা নিছক একটি বিক্ষোভ নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভের এক নতুন বিস্ফোরণ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে কটাক্ষ করার পর যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল গণজাগরণে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়েছে লাখো তরুণের মধ্যে। ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ।
আন্দোলনের মূল দাবি—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম। গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখী মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হয়েছেন ১৮০ জন। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকেও আটক করা হলেও থামেনি বিক্ষোভ। মাথায় তেলাপোকার মূর্তি পরে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলছেন—‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব, আমরা জিতব!’
এই আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক পটভূমিও কৌতূহলোদ্দীপক। ২০১৮ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, তেলাপোকার জিনসংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০টি—ঘাসফড়িংয়ের দেড় গুণ। পা হারালেও দ্রুত নতুন পা গজানোর ক্ষমতা রাখে এই প্রাণী। বিজ্ঞানের এই সত্য যেন রাজনীতিতে নতুন অর্থ পেয়েছে—অবহেলিত ও অপমানিতরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন নতুন করে ভাবার খোরাক জোগায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস এ দেশে বহু পুরোনো সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের এক গবেষণা বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৪—এই চার বছরেই ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০০৪ সালে ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল হয়েছিল প্রশ্নফাঁসের কারণে, এরপর একের পর এক নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় একই অভিযোগ উঠেছে। পিএসসির গাড়িচালক আবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করেই যেন দায় সারা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি।
ভাষার রাজনীতিও এই গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য যেভাবে আগুন ছড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ শব্দও রাতারাতি জন্ম দিয়েছে এক গণআন্দোলনের। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘ব্রয়লার চিকেন’ বলে কটাক্ষ করার ঘটনা একই শিক্ষা দেয়—রাজনীতিকদের একটি অসতর্ক শব্দই যথেষ্ট বিক্ষোভের সূচনার জন্য।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত—দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের এই ঢেউ একই সুরে বাঁধা: রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শিক্ষা-কর্মসংস্থানের সংকট। প্রযুক্তিই এসব আন্দোলনের প্রাণভোমরা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া ডাক, ব্যঙ্গাত্মক মিম আর ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে তরুণেরা গড়ে তুলছেন প্রতিরোধের নতুন ভাষা।
ককরোচ আন্দোলন সফল হবে কি ব্যর্থ, সেটিই শেষ কথা নয়। এই আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—অবহেলা আর অপমান জমতে জমতে একদিন বারুদে রূপ নিতে পারে। দিল্লিতে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশেও ঘটতে পারত, ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে—যদি প্রশ্নফাঁস বন্ধে কঠোর না হওয়া যায়, রাজনীতিকদের বাক্যবাণে সংযম না আসে, আর তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়। ইতিহাস বলছে, হাতি লোপ পায়, তেলাপোকা টিকে থাকে—দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের জন্য এটাই আজ নতুন প্রতীক।
শিরোনাম :
দিল্লির ‘ককরোচ ’ আন্দোলন, বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
-
এস কে চন্দন - আপডেট সময় ১২:৪৩:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
- 14
ট্যাগস
অভিজিৎ দীপক ককরোচ জনতা পার্টি দক্ষিণ এশিয়া রাজনীতি দিল্লি আন্দোলন নিট পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন ভারত বিক্ষোভ সূর্যকান্ত
জনপ্রিয় সংবাদ





















