শিরোনাম :
পদত্যাগ প্রশ্নে বিরক্ত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে ‘জনপ্রিয়তার শীর্ষে’ কে এই খাইরুল দেওয়ান ? শুক্রবার সারা ভারতে জুড়ে বিক্ষোভের ডাক ককরোচ পার্টির ভেনিস উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সিনেমা ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও বিতর্কের জেরে জামাত নেতা গাজী নজরুলকে বহিষ্কার, ইসি-স্পিকারকে চিঠি শাহজাদপুরে ১৫৫ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে এনসিপি নেতা গ্রেপ্তার নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ মোদির সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করবেন রাষ্ট্রপতি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর

দিল্লির ‘ককরোচ ’ আন্দোলন, বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

  • এস কে চন্দন
  • আপডেট সময় ১২:৪৩:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • 14

দিল্লির রাজপথে আজ যা ঘটছে, তা নিছক একটি বিক্ষোভ নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভের এক নতুন বিস্ফোরণ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে কটাক্ষ করার পর যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল গণজাগরণে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়েছে লাখো তরুণের মধ্যে। ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ।
আন্দোলনের মূল দাবি—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম। গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখী মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হয়েছেন ১৮০ জন। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকেও আটক করা হলেও থামেনি বিক্ষোভ। মাথায় তেলাপোকার মূর্তি পরে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলছেন—‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব, আমরা জিতব!’
এই আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক পটভূমিও কৌতূহলোদ্দীপক। ২০১৮ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, তেলাপোকার জিনসংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০টি—ঘাসফড়িংয়ের দেড় গুণ। পা হারালেও দ্রুত নতুন পা গজানোর ক্ষমতা রাখে এই প্রাণী। বিজ্ঞানের এই সত্য যেন রাজনীতিতে নতুন অর্থ পেয়েছে—অবহেলিত ও অপমানিতরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন নতুন করে ভাবার খোরাক জোগায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস এ দেশে বহু পুরোনো সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের এক গবেষণা বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৪—এই চার বছরেই ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০০৪ সালে ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল হয়েছিল প্রশ্নফাঁসের কারণে, এরপর একের পর এক নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় একই অভিযোগ উঠেছে। পিএসসির গাড়িচালক আবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করেই যেন দায় সারা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি।
ভাষার রাজনীতিও এই গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য যেভাবে আগুন ছড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ শব্দও রাতারাতি জন্ম দিয়েছে এক গণআন্দোলনের। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘ব্রয়লার চিকেন’ বলে কটাক্ষ করার ঘটনা একই শিক্ষা দেয়—রাজনীতিকদের একটি অসতর্ক শব্দই যথেষ্ট বিক্ষোভের সূচনার জন্য।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত—দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের এই ঢেউ একই সুরে বাঁধা: রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শিক্ষা-কর্মসংস্থানের সংকট। প্রযুক্তিই এসব আন্দোলনের প্রাণভোমরা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া ডাক, ব্যঙ্গাত্মক মিম আর ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে তরুণেরা গড়ে তুলছেন প্রতিরোধের নতুন ভাষা।
ককরোচ আন্দোলন সফল হবে কি ব্যর্থ, সেটিই শেষ কথা নয়। এই আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—অবহেলা আর অপমান জমতে জমতে একদিন বারুদে রূপ নিতে পারে। দিল্লিতে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশেও ঘটতে পারত, ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে—যদি প্রশ্নফাঁস বন্ধে কঠোর না হওয়া যায়, রাজনীতিকদের বাক্যবাণে সংযম না আসে, আর তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়। ইতিহাস বলছে, হাতি লোপ পায়, তেলাপোকা টিকে থাকে—দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের জন্য এটাই আজ নতুন প্রতীক।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

পদত্যাগ প্রশ্নে বিরক্ত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর

২৩ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

দিল্লির ‘ককরোচ ’ আন্দোলন, বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

আপডেট সময় ১২:৪৩:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

দিল্লির রাজপথে আজ যা ঘটছে, তা নিছক একটি বিক্ষোভ নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভের এক নতুন বিস্ফোরণ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে কটাক্ষ করার পর যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল গণজাগরণে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়েছে লাখো তরুণের মধ্যে। ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ।
আন্দোলনের মূল দাবি—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম। গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখী মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হয়েছেন ১৮০ জন। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকেও আটক করা হলেও থামেনি বিক্ষোভ। মাথায় তেলাপোকার মূর্তি পরে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলছেন—‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব, আমরা জিতব!’
এই আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক পটভূমিও কৌতূহলোদ্দীপক। ২০১৮ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, তেলাপোকার জিনসংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০টি—ঘাসফড়িংয়ের দেড় গুণ। পা হারালেও দ্রুত নতুন পা গজানোর ক্ষমতা রাখে এই প্রাণী। বিজ্ঞানের এই সত্য যেন রাজনীতিতে নতুন অর্থ পেয়েছে—অবহেলিত ও অপমানিতরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন নতুন করে ভাবার খোরাক জোগায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস এ দেশে বহু পুরোনো সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের এক গবেষণা বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৪—এই চার বছরেই ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০০৪ সালে ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল হয়েছিল প্রশ্নফাঁসের কারণে, এরপর একের পর এক নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় একই অভিযোগ উঠেছে। পিএসসির গাড়িচালক আবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করেই যেন দায় সারা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, অথচ স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি।
ভাষার রাজনীতিও এই গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য যেভাবে আগুন ছড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ শব্দও রাতারাতি জন্ম দিয়েছে এক গণআন্দোলনের। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘ব্রয়লার চিকেন’ বলে কটাক্ষ করার ঘটনা একই শিক্ষা দেয়—রাজনীতিকদের একটি অসতর্ক শব্দই যথেষ্ট বিক্ষোভের সূচনার জন্য।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত—দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের এই ঢেউ একই সুরে বাঁধা: রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শিক্ষা-কর্মসংস্থানের সংকট। প্রযুক্তিই এসব আন্দোলনের প্রাণভোমরা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া ডাক, ব্যঙ্গাত্মক মিম আর ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে তরুণেরা গড়ে তুলছেন প্রতিরোধের নতুন ভাষা।
ককরোচ আন্দোলন সফল হবে কি ব্যর্থ, সেটিই শেষ কথা নয়। এই আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—অবহেলা আর অপমান জমতে জমতে একদিন বারুদে রূপ নিতে পারে। দিল্লিতে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশেও ঘটতে পারত, ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে—যদি প্রশ্নফাঁস বন্ধে কঠোর না হওয়া যায়, রাজনীতিকদের বাক্যবাণে সংযম না আসে, আর তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়। ইতিহাস বলছে, হাতি লোপ পায়, তেলাপোকা টিকে থাকে—দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের জন্য এটাই আজ নতুন প্রতীক।

Share this news as a Photo Card