মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ডাক দিয়ে ঐতিহাসিক বিবৃতি ব্রিকসের

নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর — চীন, রাশিয়া, ইরানসহ ১১টি দেশের জোট ব্রিকস শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলো একযোগে বলেছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে এমন যেকোনো পদক্ষেপ পরিহারের অনুরোধ জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিজ নিজ জাতীয় অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেই সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই আহ্বান জানাচ্ছে, যা এই ইস্যুতে জোটের অভ্যন্তরে ভিন্নমতের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রসঙ্গত, গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রশ্নে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতভেদের জেরে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনে আয়োজক দেশ ভারতের নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পরই অবশেষে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

দুই দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত বিবৃতিতে বেসামরিক অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তথা আইএইএ-র প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনা লঙ্ঘন করে বেসামরিক স্থাপনা এবং সংস্থাটির পূর্ণ সুরক্ষায় থাকা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে যে ইচ্ছাকৃত হামলা চালানো হয়েছে, তা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। জনসাধারণ ও পরিবেশকে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সশস্ত্র সংঘাতসহ যেকোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

উল্লেখ্য, পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ব্রিকস জোট গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে ধাপে ধাপে সংস্থাটির সদস্য সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ১১-তে দাঁড়িয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত অনুযায়ী, সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ভাষণ দিতে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের পরিপন্থী। তার এই বক্তব্যে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জোটের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নয়াদিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিত রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। শনিবার দিনের শেষভাগে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানেরও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।

যৌথ বিবৃতিতে বর্তমান বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রবণতাকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা সুসংহত করতে বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। একইসঙ্গে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে যৌথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে জোটভুক্ত দেশগুলো।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে এই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের একটি বড় দৃষ্টান্ত। আগামী দিনে এই বিবৃতির বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ডাক দিয়ে ঐতিহাসিক বিবৃতি ব্রিকসের

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

পাকিস্তানের ব্রিকস সদস্যপদ লাভের চেষ্টা আটকে দিল ভারতের ভেটো ক্ষমতা

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ডাক দিয়ে ঐতিহাসিক বিবৃতি ব্রিকসের

আপডেট সময় ০৭:১০:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর — চীন, রাশিয়া, ইরানসহ ১১টি দেশের জোট ব্রিকস শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলো একযোগে বলেছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে এমন যেকোনো পদক্ষেপ পরিহারের অনুরোধ জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিজ নিজ জাতীয় অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেই সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই আহ্বান জানাচ্ছে, যা এই ইস্যুতে জোটের অভ্যন্তরে ভিন্নমতের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রসঙ্গত, গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রশ্নে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতভেদের জেরে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনে আয়োজক দেশ ভারতের নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পরই অবশেষে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

দুই দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত বিবৃতিতে বেসামরিক অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তথা আইএইএ-র প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনা লঙ্ঘন করে বেসামরিক স্থাপনা এবং সংস্থাটির পূর্ণ সুরক্ষায় থাকা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে যে ইচ্ছাকৃত হামলা চালানো হয়েছে, তা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। জনসাধারণ ও পরিবেশকে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সশস্ত্র সংঘাতসহ যেকোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

উল্লেখ্য, পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ব্রিকস জোট গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে ধাপে ধাপে সংস্থাটির সদস্য সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ১১-তে দাঁড়িয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত অনুযায়ী, সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ভাষণ দিতে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের পরিপন্থী। তার এই বক্তব্যে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জোটের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নয়াদিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিত রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। শনিবার দিনের শেষভাগে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানেরও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।

যৌথ বিবৃতিতে বর্তমান বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রবণতাকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা সুসংহত করতে বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। একইসঙ্গে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে যৌথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে জোটভুক্ত দেশগুলো।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে এই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের একটি বড় দৃষ্টান্ত। আগামী দিনে এই বিবৃতির বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

Share this news as a Photo Card