আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে স্পেন। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় লা রোহা। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে ফেটে পড়ে পুরো স্পেন। জাতীয় পতাকা কাঁধে জড়িয়ে, লাল-সোনালি জার্সি পরে কিংবা হাতে পতাকা উড়িয়ে হাজারো সমর্থক নেমে আসেন রাজপথে। মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনা, আন্দালুসিয়া থেকে ভ্যালেন্সিয়া—দেশজুড়ে শুরু হয় বিজয়োৎসবের এক অনন্য আবহ।
তবে এই উল্লাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কাতালোনিয়ার ছোট্ট জনপদ রোকাফোন্দা। কারণ, এখানেই বেড়ে উঠেছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল। বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখানো এই ফরোয়ার্ডের হাত ধরেই যেন নতুন করে বিশ্বের নজরে এসেছে বহুদিনের অবহেলিত জনপদটি।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে উপকূলীয় শহর মাতারোর একটি শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দা। বহুসংস্কৃতির মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে। স্থানীয়দের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে একটি সংখ্যা—‘৩০৪’। এটি আসলে এলাকার পোস্টাল কোড ০৮৩০৪-এর শেষ তিন অঙ্ক। দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক বৈষম্য ও নেতিবাচক পরিচয়ের ভার বহন করা এই জনপদকে অনেকেই অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। অনেক বাসিন্দাই নিজেদের ঠিকানা বলতে সংকোচ বোধ করতেন।
কিন্তু সেই গল্প এখন বদলে গেছে। বদলে দিয়েছেন লামিন ইয়ামাল। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তরুণদের একজন হয়ে ওঠার পর তিনি বারবার নিজের শেকড়ের কথা বলেছেন। গোল উদযাপনের সময় আঙুলে ‘৩০৪’ ইশারা দেখানো, রোকাফোন্দা লেখা হেডব্যান্ড পরা কিংবা বুটে বাবা-মায়ের জন্মভূমি মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির পতাকা ধারণ—সবকিছুতেই ফুটে উঠেছে নিজের পরিচয়ের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা।
স্পেনে জন্ম নেওয়া ইয়ামাল বরাবরই বলেছেন, ফুটবল মানুষের বর্ণ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিভাজনের দেয়াল ভেঙে একসূত্রে গাঁথতে পারে। মাত্র ছয় বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দেওয়া এই বিস্ময়বালক আজ শুধু বার্সেলোনার নয়, গোটা স্পেনের গর্ব। অথচ খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি ভুলে যাননি নিজের শৈশবের সেই গলি, সেই মানুষগুলোকে।
রোকাফোন্দার যে মাঠে একসময় ছোট্ট ইয়ামাল বল পায়ে স্বপ্ন বুনতেন, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে তার বিশাল দেয়ালচিত্র। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নপূরণের প্রতীক। বিশ্বকাপ জয়ের পর পুরো এলাকায় যেন উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। রাস্তায় নেমে আসেন নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—সবাই। তাদের কণ্ঠে একটাই নাম, একটাই গর্ব—লামিন ইয়ামাল।
শুধু রোকাফোন্দাই নয়, রাজধানী মাদ্রিদেও ছিল একই চিত্র। অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোলের পরপরই হাজারো সমর্থক রাজপথে নেমে আসেন। লাল-সোনালি পতাকায় মোড়া জনসমুদ্রে বারবার ধ্বনিত হতে থাকে, “চ্যাম্পিয়ন! চ্যাম্পিয়ন!” বার্সেলোনার আকাশ আলোকিত হয় আতশবাজির ঝলকে, সৈকতজুড়ে চলে রাতভর উদযাপন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আমরাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! আমাদের জাতীয় দল ছিল দুর্দান্ত। ধন্যবাদ, স্পেন!” তার এই বার্তাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
তবে আনন্দের মধ্যেও একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বিলবাওয়ে। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, বড় পর্দায় ফাইনাল ম্যাচের সম্প্রচার ব্যাহত করার চেষ্টা করা পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
২০১০ সালের পর ২০২৬—১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি স্পেনের ঘরে ফিরেছে। আর এই জয়ের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে রোকাফোন্দা নামের ছোট্ট একটি জনপদ, যার পরিচয় আজ আর শুধু একটি পোস্টাল কোড নয়; বরং বিশ্বজয়ী এক তারকার শেকড়, গর্ব আর অনুপ্রেরণার প্রতীক।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















