ঢাকা ব্যুরো | চলমানবার্তা
৩০ জুন ২০২৬
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে শুরু হয়ে গেছে মহাগুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্ব। মাঠের লড়াই যেমন জমে উঠেছে, তেমনি মাঠের বাইরেও শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ— কার হাতে উঠছে এবারের বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট? কে এগিয়ে, আর কার সম্ভাবনাই বা সবচেয়ে বেশি? ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঘুরপাক খাওয়া এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার, ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনাল্ডো নাজারিও। দ্য ফেনোমেনন’ খ্যাত এই তারকা মনে করেন, ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ বা ‘হেক্সা’ জয়ের পথে মূল বাধা ৪টি দেশ। তবে একই সাথে ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা নেইমার ও ফর্মে থাকা ভিনিসিয়ুসের যুগলবন্দির ওপরই ব্রাজিলের ভাগ্য দেখছেন তিনি।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের রাউন্ড অব ৩২’র হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে ফরাসি প্রভাবশালী ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’ (L’Équipe)-কে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক রোনাল্ডো। সেখানে তিনি খোলামেলা আলোচনা করেছেন ব্রাজিলের শক্তিমত্তা, দুর্বলতা এবং প্রতিপক্ষদের নিয়ে।
রোনাল্ডোর চোখে ব্রাজিলের ৪ ‘মহা-প্রতিদ্বন্দ্বী’
রোনাল্ডোর মতে, টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে শক্তির বিচারে কয়েকটি দল স্পষ্ট ব্যবধানে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তিনি বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা, এবং ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন ও জার্মানিকে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (যদিও টুর্নামেন্টের নাটকীয়তায় জার্মানি ইতোমধ্যে বিদায় নিয়েছে)।
রোনাল্ডো বলেন, “ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা এবং স্পেন শুরু থেকেই টুর্নামেন্টে দারুণ ও গোছানো ফুটবল খেলছে। তাদের স্কোয়াড গভীরতা এবং ধারাবাহিকতা সত্যি প্রশংসনীয়। আর জার্মানি এমন একটি দল, যারা বড় আসরে কখনোই অবহেলার সুযোগ দেয় না। নকআউট পর্বে এই দলগুলোর মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দলের জন্যই চরম পরীক্ষা।”
তবে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তাকে সমীহ করলেও নিজের দেশ ব্রাজিলকে নিয়ে বরাবরের মতোই আশাবাদী এই কিংবদন্তি। তিনি বিশ্বাস করেন, দল হিসেবে ব্রাজিল যদি সঠিক সময়ে নিজেদের সেরা ছন্দে ফিরতে পারে, তবে সেলেসাওদের আটকানো যেকোনো দলের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
নেইমারের প্রত্যাবর্তন: সমালোচকদের জবাব দেওয়ার মঞ্চ
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ভাগ্য এবং হেক্সা মিশনের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে দলটির পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রের ওপর— এমনটাই মনে করেন রোনাল্ডো। দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার পর ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড যখন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পান, তখন অনেকেই ভুরু কুঁচকেছিলেন। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে তাকে মাঠেই দেখা যায়নি। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে যখন তিনি মাঠে নামেন, সেটি ছিল দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলের জার্সিতে তার আবেগঘন প্রত্যাবর্তন।
নেইমারের এই ফিরে আসাকে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ মনে করছেন রোনাল্ডো। বর্তমান ব্রাজিল দলে নেইমারের মতো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আর কোনো ফুটবলারের নেই বলে দাবি তার।
রোনাল্ডো বলেন, “নেইমার এখন পুরোপুরি ফিট এবং চিকিৎসকদের সবুজ সংকেত পেয়েই মাঠে নেমেছে। নকআউট পর্বের এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে সমালোচকদের মুখে কুলুপ আঁটার এর চেয়ে বড় সুযোগ সে আর পাবে না।”
নিজের ২০০২-এর স্মৃতির আয়নায় নেইমারকে দেখা
চোট কাটিয়ে চেনা ছন্দে ফেরার লড়াইটা কতটা মানসিক ও শারীরিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক, তা রোনাল্ডোর চেয়ে ভালো আর কে জানেন! ২০০২ বিশ্বকাপের আগে ইন্টার মিলানের হয়ে খেলার সময় ক্যারিয়ার ধ্বংসী চোটের শিকার হয়েছিলেন তিনি। অনেকেই তখন তার ক্যারিয়ারের এপিটাফ লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে ফিরে এসে শুধু চ্যাম্পিয়নই হননি, টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট।
নেইমারের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে নিজের সেই ফেলে আসা দিনগুলোর ছায়া দেখতে পাচ্ছেন রোনাল্ডো। তিনি বলেন:
“গুরুতর চোটের পর ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আবার ফিরে আসাটা যে কতটা কঠিন, তা আমি খুব ভালো করেই জানি। সেই কারণেই নেইমারের এই প্রত্যাবর্তন আমাকে ব্যক্তিগতভাবে রোমাঞ্চিত করছে। সত্যি বলতে, নেইমারের নতুন করে আর কাউকে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। তবে সে যদি তার চেনা ছন্দ ও সেরা ফুটবলটা খেলতে পারে, তবে সে আবারও বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে এবং সবাইকে ভুল প্রমাণ করবে।”
ভিনিসিয়ুসের গতি আর নেইমারের মস্তিস্ক: এক ভয়ংকর কম্বিনেশন
চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ইতোমধ্যে চার গোল করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন। দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও কার্যকর ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভিনি।
তবে রোনাল্ডো মনে করেন, শুধু ভিনিসিয়ুসের ওপর ভর করে বিশ্বকাপ জেতা কঠিন। ব্রাজিলকে যদি ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে হয়, তবে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেল।
ফেনোমেননের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, “ভিনিসিয়ুস এখন দুর্দান্ত ফর্মে আছে, তার গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। কিন্তু এই দুর্দান্ত ফর্মের সঙ্গে যদি নেইমারের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং ঠান্ডা মাথার পাসিং যোগ হয়, তবে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ পৃথিবীর যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠবে।”
হেক্সা স্বপ্নের শেষ পরীক্ষা
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই স্নায়ুচাপের খেলা। এখানে একটি ভুল মানেই চার বছরের অপেক্ষার অবসান আর শূন্য হাতে বাড়ি ফেরা। প্রতিটি ম্যাচই এখন সেলেসাওদের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। একদিকে যেমন রয়েছে ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রয়েছে কোটি ভক্তের বহুল প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা বা ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন।
রোনাল্ডো নাজারিও মনে করিয়ে দিলেন, অতীত ইতিহাস বা পরিসংখ্যান দিয়ে নকআউট পর্ব জয় করা যায় না। মাঠে যারা ৯০ বা ১২০ মিনিট স্নায়ু ধরে রাখতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেইমারের এই সময়োচিত প্রত্যাবর্তনকে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হিসেবেই দেখছেন এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। বিশ্বজুড়ে কোটি সাম্বা ভক্ত এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন— ভিনি-নেইমারের জুটিতে ভর করে মারাকানার দেশ এবার মরুভূমি বা আমেরিকার মাটিতে নতুন কোনো ইতিহাস লেখে কি না।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 










