স্পোর্টস ডেস্ক, চলমানবার্তা
টেক্সাসের হিউস্টনে যখন দুই দল মুখোমুখি হচ্ছিল, ফুটবল রোমান্টিকদের মনে তখন উঁকি দিচ্ছিল ৫২ বছর আগের এক স্মৃতি। ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ। ডর্টমুন্ডের মাঠে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয়েছিল সুইডেন। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলেও ফুটবল ইতিহাসে তা অমর হয়ে আছে ডাচ কিংবদন্তি জোহান ক্রুইফের সেই বিখ্যাত ‘ক্রুইফ টার্ন’-এর জন্য।
৫২ বছর পর আবারও সেই চেনা দৃশ্য। হিউস্টনের মাঠে নীল জার্সি গায়ে নামলো সুইডেন। তবে এবার আর কোনো ক্রুইফ টার্ন দেখা যায়নি, যা দেখা গেল তা এক মহাকাব্যিক পুনরাবৃত্তি ও প্রতিশোধের গল্প। পাঁচ দশক আগের সেই গোলশূন্য ড্র-এর ফল এবার পুরোপুরি উল্টে দিল ডাচরা। আক্রমণ আর পাল্টা-আক্রমণে ঠাসা এক উপভোগ্য ম্যাচে সুইডেনকে ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করেছে রোনাল্ড কোম্যানের দল। এই জয়ের দিনে বিশ্বরেকর্ডের পাতায় ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছালো নেদারল্যান্ডস।
ডাচদের আগ্রাসন বনাম সুইডেনের দুর্ভাগ্য
স্কোরলাইনের ৫-১ ব্যবধান দেখে ম্যাচটিকে একপেশে ভাবলে সুইডেনের প্রতি কিছুটা অন্যায় করা হবে। খেলার শুরু থেকেই অবশ্য একচেটিয়া দাপট ছিল ডাচদের। ম্যাচের মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। তবে প্রথমার্ধের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতির পর দৃশ্যপট বদলে যায়। গুছিয়ে উঠে ডাচ রক্ষণভাগকে রীতিমতো তটস্থ করে তোলে সুইডিশ স্ট্রাইকাররা।
বিরতির পর ডাচরা আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোল করলেও পুরো ম্যাচ জুড়েই সুইডেন সমানে সমানে লড়াই করেছে। বিশেষ করে ম্যাচের শেষভাগে সুইডেনের আক্রমণভাগ ডাচ গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেনের কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে। পুরো ম্যাচে ডাচদের জয়ের মূল নায়ক আসলে গোলপোস্টের নিচের এই প্রহরীই, যিনি একাই রুখে দিয়েছেন ৭টি নিশ্চিত গোল।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, আক্রমণের দিক থেকে ডাচদের চেয়ে এগিয়ে ছিল সুইডেনই। নেদারল্যান্ডসের নেওয়া ১০টি শটের মধ্যে ৭টি ছিল অন-টার্গেট। অপরদিকে, সুইডেন ১৬টি শট নিয়ে ৮টিই রেখেছিল গোলপোস্টে। দুই দলের মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে কেবল ফিনিশিংয়ের দক্ষতা। ডাচ ফরোয়ার্ড ব্রায়ান ব্রবি কিংবা কোডি গাকপোরা যেখানে সুযোগ পেলেই বল জালে জড়িয়েছেন, সেখানে সুইডেনের ভিক্টর ইয়োকেরেস এবং আলেকসান্দার ইসাকরা ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতায় ভুগেছেন।
ব্রবির জোড়া গোল এবং ডাচদের ‘শতক’
নেদারল্যান্ডস সম্ভবত এই ম্যাচে নেমেছিল আগের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে দুবার এগিয়ে গিয়েও পয়েন্ট হারানোর আক্ষেপ ঘোচানোর তাড়না নিয়ে। ম্যাচের ৫ মিনিটেই লিভারপুল তারকা কোডি গাকপোর দারুণ এক ক্রস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ব্রায়ান ব্রবি। ১৭ মিনিটে ডেনজেল ডামফ্রিজের মাপা ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এই ফরোয়ার্ড। ব্রবির এই দ্বিতীয় গোলটি ছিল ফুটবল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের ইতিহাসের ১০০তম গোল। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে ডাচরা।
গাকপো ম্যাজিক ও বিশ্বকাপের দ্রুততম ১০০ গোল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সুইডেনের ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া নিশ্চিত করেন ডাচ উইঙ্গার কোডি গাকপো। ৪৭ মিনিটে ডামফ্রিজের চমৎকার ক্রস থেকে প্রথম গোল করেন তিনি। এর ঠিক সাত মিনিট পর, অর্থাৎ ৫৪ মিনিটে ক্রিসেনসিও সামারভিলের নিখুঁত পাস থেকে একটি নিচু শটে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন গাকপো।
লিভারপুলের এই ফরোয়ার্ডের শেষ গোলটির মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপের আসর একটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করে। এটি ছিল চলতি আসরের ৩৩তম ম্যাচে শততম গোল। ১৯৫৮ সালের পর এটাই ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে ১০০ গোল হওয়ার নজির।
চার গোল হজম করার পর ৫৯ মিনিটে একটি গোল শোধ করে সুইডেন। উইঙ্গার অ্যান্থনি এলাঙ্গার করা সেই গোলটি কেবল সুইডিশদের সান্ত্বনাই বাড়িয়েছে। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, ৮৯ মিনিটে ডাচদের গোল উৎসবের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন সামারভিল। তার গোলেই ৫-১ ব্যবধানের বিশাল জয় নিশ্চিত হয় কমলা শিবিরের।
সুইডেনের অনাকাঙ্ক্ষিত যত রেকর্ড
এই হারের পর সুইডেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু রেকর্ড গড়েছে, যা কোনো দলই পাতায় তুলতে চাইবে না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সুইডেনই প্রথম দল, যারা কোনো ম্যাচে গোলপোস্টে ন্যূনতম ৮টি শট রেখেও ৪ গোলের ব্যবধানে হেরেছে।
এখানেই শেষ নয়। চলতি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছিল সুইডেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে প্রথম ম্যাচ ৪ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জেতার পর, ঠিক পরের ম্যাচেই একই ব্যবধানে হারার অনাকাঙ্ক্ষিত এক কীর্তি এখন সুইডিশদের নামের পাশে।
পেলের ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে নেদারল্যান্ডস
সুইডেনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দিনে এক অনন্য বিশ্বরেকর্ড নিজেদের করে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। ফুটবল বিশ্বকাপে টানা সর্বোচ্চ ১৪ ম্যাচে অপরাজিত থাকার কীর্তি এখন ডাচদের দখলে। এর আগে তারা যৌথভাবে পেলের ব্রাজিলের সাথে এই রেকর্ডের অংশীদার ছিল। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত টানা ১৩ ম্যাচে অপরাজিত ছিল সে আমলের অপরাজেয় ব্রাজিল।
নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপে তাদের সর্বশেষ ম্যাচ হেরেছিল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ফাইনালে, স্পেনের বিপক্ষে। এরপর ২০১৪ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে অংশ নিলেও তারা কোনো ম্যাচ নির্ধারিত ৯০ বা ১২০ মিনিটে হারেনি, দুইবারই তারা বিদায় নিয়েছিল টাইব্রেকারের ভাগ্যলটারিতে। নিয়ম অনুযায়ী, টাইব্রেকারের ফল মূল ম্যাচের হার হিসেবে গণ্য হয় না। ফলে অপরাজিত থাকার এই অবিশ্বাস্য যাত্রা ধরে রাখল ডাচরা।
’এফ’ গ্রুপের সমীকরণ
সুইডেনের বিপক্ষে এই বিধ্বংসী জয়ের পর ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘এফ’ গ্রুপের শীর্ষস্থান মজবুত করলো রোনাল্ড কোম্যানের শিষ্যরা। এই জয়ের ফলে নকআউট বা শেষ ১৬-র টিকিট পাওয়ার দৌড়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে তারা।
সমান ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুইডেন। এক ম্যাচ খেলে ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে অবস্থান জাপানের। আর প্রথম ম্যাচে সুইডেনের কাছে বিধ্বস্ত হওয়া তিউনিসিয়া কোনো পয়েন্ট না পেয়ে টেবিলের তলানিতে অবস্থান করছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















