স্পোর্টস ডেস্ক:গ্রেট ব্রিটেন বা লাতিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তিদের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে যে কোনো দলের মনেই বাড়তি একটা চাপ থাকে। কিন্তু ঘরের মাঠে যদি সেই প্রতিপক্ষ হয় সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হারানো কোনো দল, তবে পরীক্ষাটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র সেই কঠিন পরীক্ষাই দিল, এবং দিল বেশ রাজকীয়ভাবেই।
মেক্সিকো পেরেছে, পেরেছে যুক্তরাষ্ট্রও। তবে মার্কিনদের জয়টা এসেছে অনেক বেশি দাপুটে এবং গোছানো ফুটবল খেলে। লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল মরিসিও পচেত্তিনোর শিষ্যরা।
এবারের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা। উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করেছিল মেক্সিকো। অন্যদিকে, ভালো খেলেও বসনিয়ার সঙ্গে ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয়েছে কানাডাকে। তবে তিন আয়োজকের মধ্যে সবচেয়ে আলো ছড়াল যুক্তরাষ্ট্র।
লস অ্যাঞ্জেলেসে পচেত্তিনো-ম্যাজিক
লন্ডন বা প্যারিসের ক্লাব ফুটবলে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কৌশল সাজানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে মরিসিও পচেত্তিনোর। তবে মার্কিন জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারি ভরা দর্শকের সামনে পচেত্তিনোর দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পশরা সাজায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই জয়টি কেবল বড় ব্যবধানের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রতিপক্ষের শক্তির দিক বিবেচনা করলেও এটি ফুটবল বিশ্বের জন্য একটি বড় বার্তা। লাতিন আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এই প্যারাগুয়েই হারিয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং শক্তিশালী ব্রাজিলকে। শুধু তাই নয়, লাতিন অঞ্চলের অত্যন্ত কঠিন ১৮টি ম্যাচে তারা গোল হজম করেছিল মাত্র ১০টি। রক্ষণভাগে চীনের প্রাচীর গড়ে তোলা সেই প্যারাগুয়ের জালেই আজ চারবার বল জড়াল মার্কিন ফরোয়ার্ডরা।
প্রথমার্ধেই ম্যাচ থেকে ছিটকে গেল প্যারাগুয়ে
ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে চাপে রাখে যুক্তরাষ্ট্র। ফল আসতেও সময় লাগেনি। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটে প্রথম গোলটি পায় স্বাগতিকেরা। তবে সেটি ছিল একটি আত্মঘাতী গোল। যুক্তরাষ্ট্রের একটি জোরালো আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার দামিয়ান বোবাদিয়া। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের এটিই প্রথম আত্মঘাতী গোল।
“ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচেই গোল পাওয়াটা সবসময়ই বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয়। আত্মঘাতী হলেও সেই আক্রমণের তীব্রতা ছিল প্রশংসনীয়।”
— ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে।
১-০ তে এগিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ধার আরও বেড়ে যায়। ম্যাচের দখল পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন মার্কিন মিডফিল্ডাররা। ৩১ মিনিটে দলের ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তরুণ স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে স্টেডিয়ামে উল্লাসের বন্যা বইয়ে দেন তিনি।
প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে, বিরতির বাঁশি বাজার আগ মুহূর্তে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন সেই বালোগান (জার্সি নম্বর ২০)। ফলে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় পচেত্তিনোর দল।
দ্বিতীয়র্ধে প্যারাগুয়ের প্রতিরোধ ও রেইনার শেষ পেরেক
তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল বদল করে প্যারাগুয়ে। ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে খেলতে থাকে লাতিন আমেরিকার দলটি। মাঠের লড়াই কিছুটা জমে উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ ভাঙা সহজ ছিল না।
তবে ম্যাচের ৭৩ মিনিটে একটি গোছানো আক্রমণ থেকে প্যারাগুয়ের হয়ে সান্ত্বনাসূচক একটি গোল শোধ করেন মরিসিও। ৩-১ ব্যবধান হওয়ার পর ম্যাচটি কিছুটা রোমাঞ্চকর মোড় নিলেও মার্কিন ডিফেন্ডাররা আর কোনো ভুল করেননি।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার কিছু আগে প্যারাগুয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা উইঙ্গার জিওভান্নি রেইনা। তাঁর দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ালে ৪-১ গোলের বড় জয় নিশ্চিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের।
জটিল সমীকরণে প্যারাগুয়ে, স্বস্তিতে স্বাগতিকেরা
লাতিন অঞ্চলের বাছাইপর্বে ব্রাজিলকে ১–০ আর আর্জেন্টিনাকে ২–১ গোলে হারানো প্যারাগুয়ের জন্য এই বিশাল পরাজয় বড় একটি ধাক্কা। এর আগে ২০১০ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চমক দেখিয়েছিল দলটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই বড় হারের পর এখন তাদের ‘শেষ ৩২’ বা নকআউট পর্বে ওঠার সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে গেল।
গ্রুপ পর্বে টিকে থাকতে হলে প্যারাগুয়েকে তাদের পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। আগামী ২০ জুন তুরস্কের মুখোমুখি হবে তারা।
অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচেই বড় জয়ে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট টেবিল সুসংহত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের পরবর্তী ম্যাচ আগামী ১৯ জুন, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ওশেনিয়া অঞ্চলের শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়া।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















