শিরোনাম :
আগস্টে শুরু হচ্ছে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চলাচল, ঘোষণা রেলমন্ত্রীর পেলের ব্রাজিলের বিশ্বরেকর্ড ভাঙল ডাচরা, সুইডেনকে ৫-১ গোলে ওড়াল নেদারল্যান্ডস আওয়ামী লীগের মূল টার্গেট কেন ড. ইউনূস? যাহের আলভীর কারাদণ্ড: মৃত্যুর আগে বন্ধুদের কী বলেছিলেন স্ত্রী ইকরা? মেসি কি আর্জেন্টিনার জার্সি ছেড়ে ব্রাজিলে খেলবেন? লুলার মন্তব্যে শোরগোল বিশ্বকাপ ২০২৬: প্রথম রাউন্ড শেষে নকআউটের দৌড়ে কারা এগিয়ে? রাত পোহালেই আলজেরিয়া বধের মিশন: বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাস কী বলছে? ঢাকার ভেতর আর থাকবে না দূরপাল্লার বাস: চার টার্মিনাল সরানোর মাস্টারপ্ল্যান, কোনটি যাচ্ছে কোথায়? মিরপুরে শেষ বলের নাটকীয়তা: বাংলাদেশকে ১ উইকেটে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সান্ত্বনার জয় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ

ঢাকার ভেতর আর থাকবে না দূরপাল্লার বাস: চার টার্মিনাল সরানোর মাস্টারপ্ল্যান, কোনটি যাচ্ছে কোথায়?

ঢাকা ব্যুরো :ঢাকা শহরের নাম নিলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির বহর আর কানফাটানো হর্ন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই চেনা যানজটের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা দূরপাল্লার বাস টার্মিনালগুলোকে। প্রতিদিন হাজার হাজার আন্তঃনগর বাস রাজধানীর বুক চিরে ভেতরে ঢোকে এবং বের হয়, যার জেরে থমকে যায় পুরো শহরের অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক ব্যবস্থা।

​এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় এবার এক বড় ও আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে রাজধানীর প্রধান চারটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনালকে অতিদ্রুত শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

​সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নবিষয়ক’ উচ্চপর্যায়ের এক সভায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই মহাপরিকল্পনা অনুমোদন পায়।

​চার টার্মিনালের নতুন ঠিকানা: কোনটি যাচ্ছে কোথায়?

​নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকার চারপাশের প্রবেশমুখ বা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই টার্মিনালগুলো স্থানান্তর করা হবে, যাতে দূরপাল্লার কোনো বাসকে শহরের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না হয়। পরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে এভাবে:

  • ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল \rightarrow কেরানীগঞ্জ: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসগুলোর জন্য গুলিস্তানের পরিবর্তে নতুন ঠিকানা হবে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে।
  • মহাখালী বাস টার্মিনাল \rightarrow পূর্বাচল ও টঙ্গী: উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি স্থায়ীভাবে যাবে টঙ্গীর কাছাকাছি। তবে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বাসগুলোর ডিপো হিসেবে অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হবে পূর্বাচলের একটি নির্দিষ্ট অংশ।
  • গাবতলী বাস টার্মিনাল \rightarrow হেমায়েতপুর: উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাবতলী আন্তঃনগর টার্মিনালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে।
  • সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল \rightarrow কাঁচপুর: চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বাসগুলোর মূল কেন্দ্র সায়েদাবাদকে সরিয়ে ঢাকার বাইরে কাঁচপুরে নিয়ে যাওয়া হবে।

​প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, “ঢাকার যানজট কমাতে এই চারটি টার্মিনাল শহরের বাইরে অতিদ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি শহরের ভেতর যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসের কাউন্টারগুলোকেও দ্রুত উচ্ছেদ করে নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়ার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।”

​অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা: যানজট ঠেকাতে ‘ড্রপ অ্যান্ড গো’ মডেল

​টার্মিনালগুলো পুরোপুরি ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিশাল অবকাঠামোগত প্রক্রিয়া। তাই বর্তমানের তীব্র যানজট থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

​ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহাখালী, সায়েদাবাদ বা ফুলবাড়িয়ার মতো এলাকাগুলোতে রাস্তার ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকার চেনা দৃশ্য বন্ধ করতে অস্থায়ী ডিপো ব্যবহার করা হবে। যেমন—মহাখালীর বাসগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে পূর্বাচলে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাসগুলো দূর দূরান্ত থেকে এসে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে অবস্থান করবে। সেখান থেকে শিডিউল অনুযায়ী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শুধু যাত্রী তোলার নির্দিষ্ট সময়ে টার্মিনালে আসবে এবং যাত্রী নিয়ে সরাসরি ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে। রাস্তার ওপর কোনো বাসকে পার্কিং বা অলস দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হবে না।

​ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “মহাখালী এলাকায় রাস্তার ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিকের বড় বিপর্যয় ঘটায়। এটি বন্ধ করতে আমরা পূর্বাচলে অস্থায়ী ডিপো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেখানে সিটি করপোরেশন সব ধরনের লজিস্টিক সহযোগিতা দেবে।”

​বিআরটি প্রকল্প: বিপুল বিনিয়োগের পর কী হবে ভবিষ্যৎ?

​এদিনের বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত প্রকল্প ‘বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট’ বা বিআরটি (BRT) নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বছরের পর বছর ধরে নির্মাণকাজ চলায় এই প্রকল্পের কারণে বিমানবন্দর ও উত্তরা রুটের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সম্প্রতি এই প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠায় এটি বন্ধ বা পরিত্যক্ত করার গুঞ্জন উঠেছিল।

​তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া একটি নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করবে।

​বৈঠকে উপস্থিত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “বিআরটি প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে এবং জনগণ এর জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। এখন এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা সমীচীন হবে না। তাই এই প্রকল্পটিকে কীভাবে আরও উন্নত ও সংস্কার করে একটি কার্যকর ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ হিসেবে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৭ দিনের মধ্যে আমরা এর একটি বিকল্প ও টেকসই প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দেবো।”

​ফুটপাত ও হকার ব্যবস্থাপনা: উচ্ছেদ না পুনর্বাসন?

​ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান আরেকটি কারণ হলো ফুটপাত বেদখল হয়ে যাওয়া এবং মূল সড়কের ওপর হকারদের বাজার বসে যাওয়া। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটেন, যা গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়। এই সংবেদনশীল বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা এসেছে।

​নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হকারদের হুট করে উচ্ছেদ করে বেকার না বানিয়ে, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ফুটপাতগুলোকে পুরোপুরি জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী বা পথচারী-বান্ধব করা হবে।

​ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানকে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলার মধ্যে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হকারদের বিষয়ে মানবিক ও সুশৃঙ্খল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হবে। তাদের উচ্ছেদ করে বিশৃঙ্খলা না বাড়িয়ে, কীভাবে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির আওতায় এনে পুনর্বাসন করা যায়, সেই রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।”

​আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া: এআই ক্যামেরা ও ট্রাফিক সিগন্যাল

​শুধু টার্মিনাল সরানোই নয়, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার প্রক্রিয়াও গতি পাচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরীক্ষামূলকভাবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই (AI) চালিত ট্রাফিক সিগন্যালিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা গাড়ির চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিমাপ করে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

​বৈঠকে এই এআই ক্যামেরার প্রাথমিক সুফল প্রাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং এর পরিধি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা শাহবাগে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে।

​চ্যালেঞ্জ যেখানে

​বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার টার্মিনালগুলো বাইরে সরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

​প্রথমত, কাঁচপুর বা হেমায়েতপুরের মতো দূরবর্তী জায়গায় যখন একজন যাত্রী নামবেন, তখন সেখান থেকে ঢাকার মূল শহরে ঢোকার জন্য পর্যাপ্ত এবং সাশ্রয়ী ‘কানেক্টিং ট্রান্সপোর্ট’ (যেমন: মেট্রো রেল, এমআরটি বা নগর পরিবহন বাস) থাকতে হবে। তা না হলে টার্মিনালের বাইরের এলাকাগুলোতে নতুন করে তীব্র যানজট তৈরি হতে পারে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি ও যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

​দ্বিতীয়ত, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম করা এবং দীর্ঘদিনের যত্রতত্র বাস কাউন্টার বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রয়োজন হবে।

​সচিবালয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সরকারের শীর্ষ সচিব ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার যানজট থেকে নগরবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে এই মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বলে জানানো হয়েছে

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

আগস্টে শুরু হচ্ছে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চলাচল, ঘোষণা রেলমন্ত্রীর

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ঢাকার ভেতর আর থাকবে না দূরপাল্লার বাস: চার টার্মিনাল সরানোর মাস্টারপ্ল্যান, কোনটি যাচ্ছে কোথায়?

আপডেট সময় ১০:৩১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ঢাকা ব্যুরো :ঢাকা শহরের নাম নিলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির বহর আর কানফাটানো হর্ন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই চেনা যানজটের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা দূরপাল্লার বাস টার্মিনালগুলোকে। প্রতিদিন হাজার হাজার আন্তঃনগর বাস রাজধানীর বুক চিরে ভেতরে ঢোকে এবং বের হয়, যার জেরে থমকে যায় পুরো শহরের অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক ব্যবস্থা।

​এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় এবার এক বড় ও আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে রাজধানীর প্রধান চারটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনালকে অতিদ্রুত শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

​সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নবিষয়ক’ উচ্চপর্যায়ের এক সভায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই মহাপরিকল্পনা অনুমোদন পায়।

​চার টার্মিনালের নতুন ঠিকানা: কোনটি যাচ্ছে কোথায়?

​নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকার চারপাশের প্রবেশমুখ বা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই টার্মিনালগুলো স্থানান্তর করা হবে, যাতে দূরপাল্লার কোনো বাসকে শহরের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না হয়। পরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে এভাবে:

  • ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল \rightarrow কেরানীগঞ্জ: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসগুলোর জন্য গুলিস্তানের পরিবর্তে নতুন ঠিকানা হবে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে।
  • মহাখালী বাস টার্মিনাল \rightarrow পূর্বাচল ও টঙ্গী: উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি স্থায়ীভাবে যাবে টঙ্গীর কাছাকাছি। তবে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বাসগুলোর ডিপো হিসেবে অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা হবে পূর্বাচলের একটি নির্দিষ্ট অংশ।
  • গাবতলী বাস টার্মিনাল \rightarrow হেমায়েতপুর: উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাবতলী আন্তঃনগর টার্মিনালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাভারের হেমায়েতপুরে।
  • সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল \rightarrow কাঁচপুর: চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বাসগুলোর মূল কেন্দ্র সায়েদাবাদকে সরিয়ে ঢাকার বাইরে কাঁচপুরে নিয়ে যাওয়া হবে।

​প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, “ঢাকার যানজট কমাতে এই চারটি টার্মিনাল শহরের বাইরে অতিদ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি শহরের ভেতর যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসের কাউন্টারগুলোকেও দ্রুত উচ্ছেদ করে নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়ার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।”

​অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা: যানজট ঠেকাতে ‘ড্রপ অ্যান্ড গো’ মডেল

​টার্মিনালগুলো পুরোপুরি ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিশাল অবকাঠামোগত প্রক্রিয়া। তাই বর্তমানের তীব্র যানজট থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

​ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহাখালী, সায়েদাবাদ বা ফুলবাড়িয়ার মতো এলাকাগুলোতে রাস্তার ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকার চেনা দৃশ্য বন্ধ করতে অস্থায়ী ডিপো ব্যবহার করা হবে। যেমন—মহাখালীর বাসগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে পূর্বাচলে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাসগুলো দূর দূরান্ত থেকে এসে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে অবস্থান করবে। সেখান থেকে শিডিউল অনুযায়ী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শুধু যাত্রী তোলার নির্দিষ্ট সময়ে টার্মিনালে আসবে এবং যাত্রী নিয়ে সরাসরি ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে। রাস্তার ওপর কোনো বাসকে পার্কিং বা অলস দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হবে না।

​ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “মহাখালী এলাকায় রাস্তার ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিকের বড় বিপর্যয় ঘটায়। এটি বন্ধ করতে আমরা পূর্বাচলে অস্থায়ী ডিপো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেখানে সিটি করপোরেশন সব ধরনের লজিস্টিক সহযোগিতা দেবে।”

​বিআরটি প্রকল্প: বিপুল বিনিয়োগের পর কী হবে ভবিষ্যৎ?

​এদিনের বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত প্রকল্প ‘বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট’ বা বিআরটি (BRT) নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বছরের পর বছর ধরে নির্মাণকাজ চলায় এই প্রকল্পের কারণে বিমানবন্দর ও উত্তরা রুটের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সম্প্রতি এই প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠায় এটি বন্ধ বা পরিত্যক্ত করার গুঞ্জন উঠেছিল।

​তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া একটি নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করবে।

​বৈঠকে উপস্থিত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “বিআরটি প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে এবং জনগণ এর জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। এখন এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা সমীচীন হবে না। তাই এই প্রকল্পটিকে কীভাবে আরও উন্নত ও সংস্কার করে একটি কার্যকর ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ হিসেবে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৭ দিনের মধ্যে আমরা এর একটি বিকল্প ও টেকসই প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দেবো।”

​ফুটপাত ও হকার ব্যবস্থাপনা: উচ্ছেদ না পুনর্বাসন?

​ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান আরেকটি কারণ হলো ফুটপাত বেদখল হয়ে যাওয়া এবং মূল সড়কের ওপর হকারদের বাজার বসে যাওয়া। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটেন, যা গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়। এই সংবেদনশীল বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা এসেছে।

​নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হকারদের হুট করে উচ্ছেদ করে বেকার না বানিয়ে, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ফুটপাতগুলোকে পুরোপুরি জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী বা পথচারী-বান্ধব করা হবে।

​ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানকে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলার মধ্যে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হকারদের বিষয়ে মানবিক ও সুশৃঙ্খল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হবে। তাদের উচ্ছেদ করে বিশৃঙ্খলা না বাড়িয়ে, কীভাবে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির আওতায় এনে পুনর্বাসন করা যায়, সেই রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।”

​আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া: এআই ক্যামেরা ও ট্রাফিক সিগন্যাল

​শুধু টার্মিনাল সরানোই নয়, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার প্রক্রিয়াও গতি পাচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরীক্ষামূলকভাবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই (AI) চালিত ট্রাফিক সিগন্যালিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা গাড়ির চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিমাপ করে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

​বৈঠকে এই এআই ক্যামেরার প্রাথমিক সুফল প্রাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং এর পরিধি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা শাহবাগে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে।

​চ্যালেঞ্জ যেখানে

​বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার টার্মিনালগুলো বাইরে সরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

​প্রথমত, কাঁচপুর বা হেমায়েতপুরের মতো দূরবর্তী জায়গায় যখন একজন যাত্রী নামবেন, তখন সেখান থেকে ঢাকার মূল শহরে ঢোকার জন্য পর্যাপ্ত এবং সাশ্রয়ী ‘কানেক্টিং ট্রান্সপোর্ট’ (যেমন: মেট্রো রেল, এমআরটি বা নগর পরিবহন বাস) থাকতে হবে। তা না হলে টার্মিনালের বাইরের এলাকাগুলোতে নতুন করে তীব্র যানজট তৈরি হতে পারে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি ও যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

​দ্বিতীয়ত, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম করা এবং দীর্ঘদিনের যত্রতত্র বাস কাউন্টার বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রয়োজন হবে।

​সচিবালয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সরকারের শীর্ষ সচিব ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার যানজট থেকে নগরবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে এই মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বলে জানানো হয়েছে