শিরোনাম :
সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি ক্যাঙারু কোর্ট’ মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির আওয়ামীপন্থি দুই আইনজীবী, চাইলেন নিঃশর্ত ক্ষমা কে পাঠালেন উড়োজাহাজে করে পরীমনিকে শিউলি ফুল? ফেব্রুয়ারি ছেড়ে জানুয়ারিতে বইমেলা, প্রশ্ন উঠছে একুশের চেতনা নিয়ে পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড় ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা নিয়ে গেম ‘বাপের রাস্তা’ পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্টমার্টিন ডেঙ্গুতে রেকর্ড রোগী, হামের উপসর্গে একদিনে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হাসিঠাট্টা থেকে লাল কার্ড, বিতর্কে জড়িয়ে মাঠের বাইরে নেইমার উচ্চকক্ষে ভোট ও আসনের ভাগসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রস্তাব

পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। অথচ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর মধ্যেই বইয়ের ছবি নিয়ে একের পর এক বিতর্ক উঠছে। ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’র প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে বিতর্ক থামতে না থামতেই এবার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বইয়ে নৌকার ছবি নিয়ে আপত্তি উঠেছে।

একদিকে ছবি সংশোধনের দাবি, অন্যদিকে মুদ্রণে ধীরগতি, দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ আর নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের চেষ্টা। সব মিলিয়ে আগামী জানুয়ারিতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কোন স্তরে ছাপা কতটা এগিয়েছে

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। তবে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাধ্যমিকে মোট বইয়ের মাত্র ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে। অনেক মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানে এখনো কোনো বইয়ের পিডিআই হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নবম ও দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ চলছে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

এনসিটিবির হিসাবে, গত রোববার পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকে মোট বই ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টির ছাপা ও বাঁধাই শেষ। পিডিআইয়ের পর মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি মিলেছে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টির, যা মোট বইয়ের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিকে বই রয়েছে মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৬টি। এর মধ্যে ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে ৬ কোটি ২৮ লাখ ২ হাজার ৮টি। মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৩৬০টি, অর্থাৎ ৭১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

ইবতেদায়ি স্তরে মোট বই ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি। ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ১২১টির। পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৩টির, যা ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

মাধ্যমিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বই আছে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি। ছাপা ও বাঁধাই শেষ ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৫টির। পিডিআই হয়েছে ৫ কোটি ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৫২টির।

এনসিটিবির একটি সূত্র জানায়, মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ১১০টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান। এর অন্তত ৩০টি এখনো ঠিকমতো কাজ শুরু করেনি, তাদের কোনো বইয়ের পিডিআইও হয়নি। এ ছাড়া নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টার অভিযোগে প্রায় ১০ লাখ ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে প্রাথমিকের ৩ হাজার ৩৩৪টি বই।

মুদ্রণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশের অভিযোগ, কাগজে-কলমে যত বইয়ের পিডিআই দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তত বই পরীক্ষা করা হয়নি। তাঁদের দাবি, তদারকি প্রতিষ্ঠান ও প্রেস মালিকদের যোগসাজশে পিডিআইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।

দাঁড়িপাল্লার পর নৌকা

ছবি নিয়ে বিতর্কের শুরু ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘নলেজ পিরামিড’ বা জ্ঞানের পিরামিডে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার ঘিরে। আপত্তি ওঠার পর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয় এনসিটিবি।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বইটির মোট ৩৮ লাখ কপির মধ্যে ২০ লাখ ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে। বাকি ১৮ লাখ কপির ছাপা চলছে। সরবরাহ করা বই ফিরিয়ে এনে সংশোধিত পৃষ্ঠা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান ছাপাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বইয়ে জ্ঞানের পিরামিডের চার স্তর, অর্থাৎ উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নাম থাকবে। তবে কোনো প্রতীক বা আইকন থাকবে না। এনসিটিবির সদস্য এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, ‘আগামী বছর এভাবেই বই যাবে। পরের বছর বিষয়গুলো আরও পরিমার্জন করা হবে, যাতে কোনো ভুল তথ্য না যায়।’ বোর্ড জানিয়েছে, সংশোধনের খরচ প্রেস মালিকেরা নিজেরাই বহন করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা আছে, এতে সরকারের অন্তত ৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে নৌকার ছবি নিয়ে আপত্তি তুলেছে একটি গোষ্ঠী। তারা বইগুলো সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নতুন করে ছাপতে হলে বিপুল সংখ্যক বই পুনর্মুদ্রণ করতে হতে পারে। তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট ৮২টি নৌকার ছবি আছে: প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ ৩৪টি, দ্বিতীয়তে ২৩টি ও তৃতীয়তে ২৫টি।

একটি সূত্রের দাবি, এসব ছবি এবার নতুন করে যুক্ত হয়নি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বইয়েও একই ছবি ছিল এবং বিষয়বস্তুর প্রয়োজনেই সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই পরিমার্জনের সমন্বয়ের দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চার শিক্ষক। বিশেষজ্ঞ প্যানেলও নৌকার ছবি নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি বা পরিবর্তনের সুপারিশ করেনি। সমন্বয়কদের একজন, অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, বলেন, ‘এখনো বইটি রিভিউ করার সময় পাইনি। রিভিউ করে বিস্তারিত বলতে পারব।’

দরপত্র ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

বই ছাপার দরপত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি চক্র প্রাক্কলিত দরের তথ্য ফাঁস করে একক দরদাতার মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয়, আর এতে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে।

নথি অনুযায়ী, ৪৫টি দরপত্রের ৩০টিতে একজন, ১৩টিতে দুজন এবং দুটিতে তিনজন দরদাতা অংশ নেন। একক দরদাতা, যোগ্যতার ঘাটতি ও বিকল্প দরদাতা না পাওয়ায় ৩৪টি লটে পুনঃদরপত্র ডাকতে হয়। এসব লটের মোট প্রাক্কলিত দর ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। সুপারিশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দর ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৬ টাকা। ফলে সরকারের প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দরপত্রের তথ্য ফাঁস ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেলসহ বেশ কয়েকজন প্রেস মালিকের নাম এসেছে। অভিযুক্ত প্রেস মালিকেরা এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁরা সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্বচ্ছতার তাগিদ

মুদ্রণ শিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল খান বলেন, ‘বই ছাপায় সব স্তরে স্বচ্ছতা না থাকলে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতারিত হয়।’ তাঁর মতে, শেষ সময়ে এনসিটিবির তৎপরতা অব্যাহত রাখা দরকার। তিনি আরও বলেন, যত বইয়ের পিডিআই হচ্ছে, ততগুলো মাঠে যাচ্ছে না বলে তাঁরা শুনেছেন, তাই নজরদারি বাড়ানো উচিত।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ভুলত্রুটি ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্পন্ন বই পৌঁছে দিতে বোর্ড কঠোর অবস্থানে আছে এবং অনিয়ম করলে কেউ ছাড় পাবেন না।

ছবি-বিতর্ক, মুদ্রণের ধীরগতি, নিম্নমানের কাগজ ও দরপত্রের অভিযোগের মধ্যে এখন নজর এনসিটিবির গতি ও তদারকির দিকে। কারণ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে মানসম্মত বই তুলে দেওয়ার প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

উচ্চকক্ষে ভোট ও আসনের ভাগসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রস্তাব

২৫ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

আপডেট সময় ১২:২২:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। অথচ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর মধ্যেই বইয়ের ছবি নিয়ে একের পর এক বিতর্ক উঠছে। ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’র প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে বিতর্ক থামতে না থামতেই এবার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বইয়ে নৌকার ছবি নিয়ে আপত্তি উঠেছে।

একদিকে ছবি সংশোধনের দাবি, অন্যদিকে মুদ্রণে ধীরগতি, দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ আর নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের চেষ্টা। সব মিলিয়ে আগামী জানুয়ারিতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কোন স্তরে ছাপা কতটা এগিয়েছে

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। তবে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাধ্যমিকে মোট বইয়ের মাত্র ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে। অনেক মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানে এখনো কোনো বইয়ের পিডিআই হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নবম ও দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজ চলছে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

এনসিটিবির হিসাবে, গত রোববার পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকে মোট বই ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টির ছাপা ও বাঁধাই শেষ। পিডিআইয়ের পর মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি মিলেছে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টির, যা মোট বইয়ের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিকে বই রয়েছে মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৬টি। এর মধ্যে ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে ৬ কোটি ২৮ লাখ ২ হাজার ৮টি। মাঠপর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৩৬০টি, অর্থাৎ ৭১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

ইবতেদায়ি স্তরে মোট বই ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি। ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ১২১টির। পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৩টির, যা ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

মাধ্যমিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বই আছে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি। ছাপা ও বাঁধাই শেষ ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৫টির। পিডিআই হয়েছে ৫ কোটি ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৫২টির।

এনসিটিবির একটি সূত্র জানায়, মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ১১০টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান। এর অন্তত ৩০টি এখনো ঠিকমতো কাজ শুরু করেনি, তাদের কোনো বইয়ের পিডিআইও হয়নি। এ ছাড়া নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টার অভিযোগে প্রায় ১০ লাখ ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে প্রাথমিকের ৩ হাজার ৩৩৪টি বই।

মুদ্রণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশের অভিযোগ, কাগজে-কলমে যত বইয়ের পিডিআই দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তত বই পরীক্ষা করা হয়নি। তাঁদের দাবি, তদারকি প্রতিষ্ঠান ও প্রেস মালিকদের যোগসাজশে পিডিআইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।

দাঁড়িপাল্লার পর নৌকা

ছবি নিয়ে বিতর্কের শুরু ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘নলেজ পিরামিড’ বা জ্ঞানের পিরামিডে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার ঘিরে। আপত্তি ওঠার পর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয় এনসিটিবি।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বইটির মোট ৩৮ লাখ কপির মধ্যে ২০ লাখ ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে। বাকি ১৮ লাখ কপির ছাপা চলছে। সরবরাহ করা বই ফিরিয়ে এনে সংশোধিত পৃষ্ঠা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান ছাপাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বইয়ে জ্ঞানের পিরামিডের চার স্তর, অর্থাৎ উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নাম থাকবে। তবে কোনো প্রতীক বা আইকন থাকবে না। এনসিটিবির সদস্য এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, ‘আগামী বছর এভাবেই বই যাবে। পরের বছর বিষয়গুলো আরও পরিমার্জন করা হবে, যাতে কোনো ভুল তথ্য না যায়।’ বোর্ড জানিয়েছে, সংশোধনের খরচ প্রেস মালিকেরা নিজেরাই বহন করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা আছে, এতে সরকারের অন্তত ৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে নৌকার ছবি নিয়ে আপত্তি তুলেছে একটি গোষ্ঠী। তারা বইগুলো সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নতুন করে ছাপতে হলে বিপুল সংখ্যক বই পুনর্মুদ্রণ করতে হতে পারে। তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট ৮২টি নৌকার ছবি আছে: প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ ৩৪টি, দ্বিতীয়তে ২৩টি ও তৃতীয়তে ২৫টি।

একটি সূত্রের দাবি, এসব ছবি এবার নতুন করে যুক্ত হয়নি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বইয়েও একই ছবি ছিল এবং বিষয়বস্তুর প্রয়োজনেই সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই পরিমার্জনের সমন্বয়ের দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চার শিক্ষক। বিশেষজ্ঞ প্যানেলও নৌকার ছবি নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি বা পরিবর্তনের সুপারিশ করেনি। সমন্বয়কদের একজন, অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, বলেন, ‘এখনো বইটি রিভিউ করার সময় পাইনি। রিভিউ করে বিস্তারিত বলতে পারব।’

দরপত্র ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

বই ছাপার দরপত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি চক্র প্রাক্কলিত দরের তথ্য ফাঁস করে একক দরদাতার মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয়, আর এতে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে।

নথি অনুযায়ী, ৪৫টি দরপত্রের ৩০টিতে একজন, ১৩টিতে দুজন এবং দুটিতে তিনজন দরদাতা অংশ নেন। একক দরদাতা, যোগ্যতার ঘাটতি ও বিকল্প দরদাতা না পাওয়ায় ৩৪টি লটে পুনঃদরপত্র ডাকতে হয়। এসব লটের মোট প্রাক্কলিত দর ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। সুপারিশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দর ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৬ টাকা। ফলে সরকারের প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দরপত্রের তথ্য ফাঁস ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেলসহ বেশ কয়েকজন প্রেস মালিকের নাম এসেছে। অভিযুক্ত প্রেস মালিকেরা এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁরা সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্বচ্ছতার তাগিদ

মুদ্রণ শিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল খান বলেন, ‘বই ছাপায় সব স্তরে স্বচ্ছতা না থাকলে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতারিত হয়।’ তাঁর মতে, শেষ সময়ে এনসিটিবির তৎপরতা অব্যাহত রাখা দরকার। তিনি আরও বলেন, যত বইয়ের পিডিআই হচ্ছে, ততগুলো মাঠে যাচ্ছে না বলে তাঁরা শুনেছেন, তাই নজরদারি বাড়ানো উচিত।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ভুলত্রুটি ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্পন্ন বই পৌঁছে দিতে বোর্ড কঠোর অবস্থানে আছে এবং অনিয়ম করলে কেউ ছাড় পাবেন না।

ছবি-বিতর্ক, মুদ্রণের ধীরগতি, নিম্নমানের কাগজ ও দরপত্রের অভিযোগের মধ্যে এখন নজর এনসিটিবির গতি ও তদারকির দিকে। কারণ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে মানসম্মত বই তুলে দেওয়ার প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

Share this news as a Photo Card