ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে প্রাণের মেলা বসার যে রীতি, আবারও তাতে ছেদ পড়ছে। ২০২৭ সালের অমর একুশে বইমেলা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি, চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কারণ, আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হওয়ার কথা। তবে মেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, আয়োজক ও প্রকাশকেরা বাণিজ্যের কথা ভেবেই সময় বদলাচ্ছেন। এতে মাতৃভাষার মূল চেতনা থেকে মেলা অনেকটা সরে যাচ্ছে বলে তাঁদের মত।
কীভাবে ঠিক হলো নতুন সময়
২০২৬ সালের মেলা ঘিরে অনিশ্চয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঘোষণা আসে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজান বিবেচনায় মেলা হবে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রকাশক ও লেখকদের প্রতিবাদের মুখে ১০ দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। পরে নির্বাচনের পর মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে ২০ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মেলা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি, চলে ১৫ মার্চ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৮ দিন। পুরো মেলাই হয় রমজানের মধ্যে।
এই অভিজ্ঞতার পর ২০২৭ সালের মেলার সময় এগিয়ে আনার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমিকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটি ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলার প্রস্তাব দেয়। চিঠিতে বলা হয়, রমজানের কারণে সময় এগিয়ে আনার প্রয়োজন থাকলেও ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও আবেগের সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।
গত ১৩ অক্টোবর বাংলা একাডেমিতে প্রকাশক-প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় নতুন সময়সূচি চূড়ান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। প্রতিনিধিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ঠিক হয়, মেলা চলবে ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি। ১৮ অক্টোবর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তা জানানো হয়। প্রস্তুতি প্রসঙ্গে একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, প্রতিবছর মেলা আয়োজনের অভিজ্ঞতা ও নিয়মিত প্রস্তুতি থাকায় একাডেমি প্রস্তুত রয়েছে।
একসময় ছিল চটের ওপর ৩২টি বই
বইমেলার সূচনা স্বাধীনতার পর। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বর্ধমান হাউসের সামনে চট বিছিয়ে ৩২টি বই নিয়ে বসেন। সেখান থেকেই বর্তমান ধারার মেলার যাত্রা। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়, পরের বছর যুক্ত হয় প্রকাশক-বিক্রেতাদের সমিতি। শুরুতে আট থেকে ১০ দিনের মেলা ক্রমে দীর্ঘ হতে থাকে। ১৯৮৪ সালে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে মাসব্যাপী আয়োজনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে মেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিসর বাড়ায়, আর ২০২১ সালে এর নাম হয় অমর একুশে বইমেলা।
এর মধ্যেও সময়সূচিতে বদল এসেছে বারবার। ২০২০ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কারণে মেলা শুরু হয় ২ ফেব্রুয়ারি। পরের বছর করোনা মহামারির কারণে উদ্বোধন পিছিয়ে ১৮ মার্চ হয়। ২০২২ সালে মেলা শুরু হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি, মেয়াদ বেড়ে চলে ১৭ মার্চ পর্যন্ত। ২০২৪ সালে বৃষ্টিতে প্রথম দুই দিন বিঘ্নিত হওয়ায় মেলা চলে ২ মার্চ পর্যন্ত। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়েই মেলা হয়।
চেতনা বনাম অর্থনীতি
লেখক ও গবেষক সালেক খোকনের মতে, বারবার সময় বদল শুধু তারিখের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে একুশের চেতনা ধারণের প্রশ্নও জড়িত। তাঁর প্রশ্ন, মেলা যদি জানুয়ারি, মার্চ বা এপ্রিলে হয়, তাহলে একে ‘অমর একুশে’ বলা কেন? তিনি মনে করেন, বই বিক্রি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ মেলাকে সাধারণ বইমেলার মতো দেখা উচিত নয়। সময়সূচি ঠিক করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও প্রকাশকদের সচেতন ভূমিকা থাকা দরকার বলেও তাঁর মত।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিনের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তিনি বলেন, একুশে বইমেলা শুরু হয়েছিল প্রকাশকদের উদ্যোগে, সরকারি উদ্যোগে নয়; অন্য সব সাংস্কৃতিক মেলার মতো এর সঙ্গেও অর্থনীতি জড়িত। বইমেলা লাভজনক না হলে প্রকাশকদের অস্তিত্ব এবং একুশের চেতনার অস্তিত্বও হুমকিতে পড়বে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, দুই বছর ধরে তা-ই ঘটছে; এবার ভিন্ন অভিজ্ঞতার আশা করছেন তিনি।
বিক্রি ও নতুন বই কমছে
প্রকাশকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বিক্রি। ২০২৬ সালের মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ২৬৯টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ছিল প্রায় আট কোটি টাকা। ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য গড় করলে পুরো মেলার বিক্রি দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা। তবে এটি অনুমানভিত্তিক হিসাব, নিরীক্ষিত পরিসংখ্যান নয়। আগের বছরগুলোর বিক্রির অঙ্ক ছিল বেশি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত হিসাবে ২০২৫ সালে আনুমানিক ৪০ কোটি, ২০২৪ সালে ৬০ কোটি এবং ২০২০ সালে ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রির কথা বলা হয়েছে। এসব অঙ্কও প্রকাশকদের দেওয়া তথ্যনির্ভর, নিরীক্ষিত নয়। ২০২১ সালে বিক্রি নেমে আসে তিন কোটি ১১ লাখ টাকায়, যা এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম।
নতুন বইয়ের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৬ সালের মেলায় মোট নতুন বই এসেছে দুই হাজার ৭টি, যদিও ১৪ মার্চ পর্যন্ত তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েছিল এক হাজার ৭৭১টি। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল তিন হাজার ২৯৩ এবং ২০২৪ সালে তিন হাজার ৭৫১। সব প্রকাশক তথ্যকেন্দ্রে তথ্য জমা দেন না, তাই প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রকাশকদের মতে, দেরিতে মেলা শুরু ও রমজানের মধ্যে মেলা চলায় ক্রেতার উপস্থিতি কমেছে। তবে বিক্রি ও নতুন বই কমার একমাত্র কারণ সময়সূচির বদল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। বইয়ের দাম, পাঠকের ব্যয় করার সামর্থ্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।
উৎসবের উচ্ছ্বাস কি ফিকে হচ্ছে
১৯৮৮ সাল থেকে মেলায় অংশ নিচ্ছেন সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ। তাঁর মতে, একসময় এটি বই কেনাবেচার বাইরেও বড় সাংস্কৃতিক উৎসব হয়ে উঠেছিল। মেলার টানে প্রবাসী লেখকেরা দেশে ফিরতেন, পাঠকেরা নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকতেন। এখন সেই আগ্রহ আগের মতো চোখে পড়ছে না বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, মেলাকে কেন্দ্র করে বই প্রকাশ করবেন, কিন্তু আগের মতো উৎসবের উচ্ছ্বাস অনুভব করছেন না। তাঁর মতে, দায় শুধু নতুন প্রজন্মের নয়; আয়োজক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্তদেরই ভাবতে হবে কীভাবে নতুন প্রজন্মকে মেলার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
প্রকাশনার পরিকল্পনাও মেলার তারিখের ওপর নির্ভর করে। পাণ্ডুলিপি বাছাই, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, ছাপা ও বাজারজাত করতে সময় লাগে। তারিখ অনিশ্চিত থাকলে এসব পরিকল্পনাও প্রভাবিত হয়। তবে সময় বদলের কারণে ঠিক কতটি বই কম প্রকাশিত হয়েছে বা কত টাকার বিক্রি কমেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য নেই।
গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হকের মতে, মেলার সূচনার মূল ভিত্তি ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। মেলার পরিসর ও প্রকাশকের সংখ্যা বাড়লেও বইয়ের সামগ্রিক বিকাশে নীতিগত উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। গ্রন্থনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। তাঁর মতে, শুধু মেলা আয়োজনে মনোযোগ দিলে চলবে না; সরকার, বাংলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ এবং পাঠক তৈরির দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া সংকট কাটানো কঠিন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















