আগামী বছরের ২৭ মের মধ্যে পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে ২১ জানুয়ারি প্রায় ৮০০ ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ শুরু হবে।
কমিশনের বার্তা স্পষ্ট। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার,পেশিশক্তির ব্যবহার কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক শাস্তি হবে। দোষী প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে।
সময়সূচি
গত সোমবার কমিশন সভা শেষে পাঁচ ধাপের এই সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ভোট হবে ২০২৭ সালের—
- ২১ জানুয়ারি (প্রথম ধাপ)
- ৪ ফেব্রুয়ারি (দ্বিতীয় ধাপ)
- ২৯ এপ্রিল (তৃতীয় ধাপ)
- ১৩ মে (চতুর্থ ধাপ)
- ২৭ মে (পঞ্চম ধাপ)
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব পরিষদের নির্বাচন শেষ করতে হবে। তফসিল ঘোষণা করবেন সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা। সাধারণত ভোটগ্রহণের ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল দেওয়া হবে।
কোন এলাকায় আগে ভোট
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপভিত্তিক নির্বাচনি এলাকা ঠিক করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে ভোট হবে জেলা সদরসংলগ্ন ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে, এরপর উপজেলা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়নগুলোতে।
এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো সহজ হবে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে। প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা যাবে।
‘আমাদের নিজস্ব কোনো মোটিভ নেই’
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে মানদণ্ড, সেই আলোকে অবশ্যই ভালো নির্বাচন করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। আমাদের নিজস্ব কোনো মোটিভ নেই। আমরা ভালো নির্বাচন করার জন্যই দায়িত্ব নিয়েছি। ভালো নির্বাচন করার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই আমরা করব। আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা থাকবে।’
তিনি আরও জানান, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে। দলগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হবে, যাতে সবাই মিলে সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন, শাস্তিও হবে তাৎক্ষণিক
প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে কমিশনের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনে জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ—দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো পক্ষের প্রতি বিশেষ বিবেচনা থাকবে না। মারামারি, বিশৃঙ্খলা বা পেশিশক্তির ব্যবহার বরদাশত করা হবে না। কোনো প্রার্থী এসব কর্মকাণ্ডে জড়ালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করা হতে পারে।
তবে শুধু শাস্তি দেওয়া বা নির্বাচন বন্ধ করা কমিশনের উদ্দেশ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, মানুষ যাতে অপরাধ থেকে বিরত থাকে এবং আইন মেনে চলে, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করাই কমিশনের লক্ষ্য।
বিধিমালায় কী আছে
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধিত নির্বাচন বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুযায়ী নিচের কাজগুলো অপরাধ—
- হুমকি, ভয়ভীতি, আঘাত বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারীকে বাধা দেওয়া বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা
- কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষকের কাজে বাধা দেওয়া, তাঁদের শারীরিক ক্ষতি করা কিংবা কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট করা
- ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া বা চেষ্টা করা
- প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে বিরত রাখা, কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা
দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা
সংশোধিত বিধিমালায় প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও স্পষ্ট করা হয়েছে। কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে চেয়ারম্যান বা সদস্য পদের কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনি এজেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন, তাহলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন সন্তুষ্ট হলে—অর্থাৎ প্রার্থী, তাঁর এজেন্ট, অথবা তাঁর নির্দেশে কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কেউ বিধি ভেঙেছেন—লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
অনিয়ম হলে ফল স্থগিত, আবার ভোট
বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের মাধ্যমে কোনো কেন্দ্র বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হলে সেসব কেন্দ্রের ফল স্থগিত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে কমিশন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালিয়ে ফল প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারবে। অনুসন্ধানে ন্যায়সংগত মনে হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে সেখানে নতুন করে ভোটগ্রহণের নির্দেশও দিতে পারবে।
নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণে মনিটরিং কমিটি গঠনের বিধানও রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর কমিশন নির্ধারিত সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কমিটি গঠন করতে পারবে।
প্রেক্ষাপট ও সামনের পথ
সব মিলিয়ে পাঁচ ধাপে ভোট আয়োজনের পাশাপাশি নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, তাৎক্ষণিক বিচার, প্রার্থিতা বাতিল এবং অনিয়মপূর্ণ কেন্দ্রে পুনরায় ভোটের বিধান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়, সুষ্ঠু নির্বাচন অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: বাসস
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















