ফরিদপুরের সদরপুরে অনৈতিক সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে এক গৃহবধূকে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে। তাঁর চুলও কেটে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। একই ঘটনায় গৃহবধূর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া এক যুবককে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। গত রোববার সকালে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
গৃহবধূর বয়স ৩৫ বছর। তাঁর স্বামী মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী। নির্যাতনের শিকার যুবকের বয়স ৩০ বছর, তিনি ওই গৃহবধূর শ্বশুরবাড়ির প্রতিবেশী। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, নির্যাতনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুমন হোসেন ও জয় হোসেন। তাঁরা একই এলাকার মাতুব্বর ইউসুফ বেপারির নাতি। ইউসুফ বেপারি আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়তে চান।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও
ঘটনার দুটি ভিডিও রোববার রাতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটিতে দেখা যায়, গৃহবধূকে চেয়ারে বসিয়ে এক যুবক তাঁর হাত ধরে রেখেছেন, আরেকজন কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দিচ্ছেন। ভুক্তভোগী চিৎকার করলেও চুল কাটা থামেনি। একপর্যায়ে তাঁকে চড় মারতেও দেখা যায়। অন্য ভিডিওতে রাতের বেলা ওই যুবককে গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করার দৃশ্য রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র যা বলছে
স্থানীয় সূত্রগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, গত শনিবার গৃহবধূ বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন। সেদিন রাতে প্রতিবেশী যুবক তাঁর কক্ষে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাইরে থেকে দরজা আটকে দুজনকে বন্দী করেন। চুল কেটে দেওয়ার পর পরদিন বিকেলে গৃহবধূকে তাঁর বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে এবং যুবককে তাঁর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিবার ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
গৃহবধূর বাবা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ি পছন্দ করেন না। তাঁরা প্রায়ই নির্যাতন করতেন।’ তাঁর ভাষ্য, ওই যুবকের কাছে তিনি পাঁচ হাজার টাকা পান। সেই টাকা ফেরত দিতেই যুবক গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের আটকে নির্যাতন করা হয়। দৃশ্যটি ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় মেয়ের সম্মানহানি হয়েছে বলেও তিনি জানান। গৃহবধূ বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় তাঁরা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে ঘটনা সাজিয়েছেন। আমার চুল কেটে দেওয়া হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
নির্যাতনের শিকার যুবকও একই কথা বলেছেন, ‘আমি টাকা ফেরত দিতে ভাবির কাছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাদের আটকে রাখা হয়। পরে আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। উনার সঙ্গে আমার কোনো অবৈধ সম্পর্ক নেই। আমরা মাদকও সেবন করিনি।’
অন্যদিকে গৃহবধূর শ্বশুর-শাশুড়ির অভিযোগ, তাঁদের পুত্রবধূ মাদক সেবন করেন এবং একাধিক পুরুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের দাবি, দুজনকে হাতেনাতে আটক করার পর এলাকাবাসী যুবককে মারধর করে ও গৃহবধূর চুল কেটে দেয়।
অভিযুক্তপক্ষের বক্তব্য
সুমন হোসেন ও জয় হোসেনকে তাঁদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তাঁদের দাদা ইউসুফ বেপারি বলেন, খবর পেয়ে তিনি ওই বাড়িতে যান। পরদিন গৃহবধূকে তাঁর বাবার কাছে এবং যুবককে তাঁর বাবার কাছে বুঝিয়ে দেন। তাঁর দাবি, গৃহবধূর বাড়িতে বিভিন্ন লোকের যাতায়াতের অভিযোগ আছে। তবে চুল কাটার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না।
পুলিশ ও আইনজীবীর বক্তব্য
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ। তিনি বলেন, এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, ‘কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনবিরোধী কাজ। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী তুহিন মৃধা বলেন, পরকীয়া, মাদক সেবন বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কাউকে আটকে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই। এতে ভুক্তভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে এবং আইনি প্রক্রিয়াতেই বিচার চাইতে হবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















