চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
১৪ জুন ২০২৬
একটি ব্যস্ততম বাজার। ভরদুপুরে সাধারণ মানুষের আনাগোনা আর কোলাহলে মুখরিত চারপাশ। ঠিক তখনই একটি অটোরিকশা থেকে নেমে আসে একদল সশস্ত্র যুবক। মুহূর্তের মধ্যে একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে চালানো হয় উপর্যুপরি গুলি। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর চারদিকে আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে আবার অটোরিকশায় চড়েই নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
শনিবার (১৩ জুন) বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে এভাবেই অত্যন্ত নৃশংস কায়দায় খুন করা হয় পার্শ্ববর্তী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫)। পুলিশ প্রশাসনের একটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাত্র আধা কিলোমিটারের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পুরো দৃশ্যটি ধরা পড়েছে বাজারের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায়।
সিসিটিভি ফুটেজে অস্ত্রের মহড়া
চৌমুহনী বাজারের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় পাঁচ থেকে সাতজন সন্ত্রাসী। এদের মধ্যে একজনের মুখে কালো মুখোশ থাকলেও বাকিদের চেহারা ছিল সম্পূর্ণ অনাবৃত ও স্পষ্ট। সিসিটিভি ক্যামেরার চিত্রে দেখা যায়, হামলাকারীদের মধ্যে তিনজনের হাতে ছিল পিস্তল এবং দুজনের হাতে ছিল শটগান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবদল নেতা মাসুদুল হকের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর সন্ত্রাসীদের কয়েকজন পিস্তল ও শটগান থেকে অনবরত ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় তারা চিৎকার করে বাজারের ব্যবসায়ী ও পথচারীদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে— “কেউ কাছে আসবি না, সব দোকানপাট বন্ধ করে চলে যা।”
নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই। পারিবারিকভাবে জানা গেছে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনি নিজে বেতাগী ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
যেভাবে করা হয় অবরুদ্ধ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের চৌমুহনী বাজারে আসেন মাসুদুল। তবে তিনি জানতেন না যে, আরেকটি অটোরিকশায় করে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী শুরু থেকেই তাঁকে অনুসরণ করছিল।
মাসুদুল অটোরিকশা থেকে নেমে বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই পেছনের গাড়ি থেকে নেমে আসে অস্ত্রধারীরা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিতে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝাঁঝরা হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই যুবদল নেতা। এরপর খুনিরা রাউজানের কদলপুরের পাহাড়ি পথ ধরে পালিয়ে যায়।
বিকেলে পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। আজ রোববার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক
দিনদুপুরে এমন ফিল্মি কায়দায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পর চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা চৌমুহনী বাজারে। ঘটনার পরপরই প্রাণভয়ে দোকানপাট বন্ধ করে দ্রুত ঘরে ফেরেন ব্যবসায়ীরা।
বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল মাবুদ বলেন:
“দিনদুপুরে এমন ভয়ংকর গোলাগুলি আর নৃশংসতা আমি এই বাজারে আগে কখনো দেখিনি। বাজারে ৩০টিরও বেশি সিসি ক্যামেরা বসানো আছে, পুলিশ ফাঁড়িও কাছে। তারপরও সন্ত্রাসীরা এভাবে প্রকাশ্যে মানুষ খুন করে চলে গেল! আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
রাউজানে থামছে না লাশের মিছিল
রাউজানে এ ধরনের রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড এবারই প্রথম নয়। ঠিক দেড় মাস আগে, প্রায় একই কায়দায় উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের শমসের পাড়ায় মুহাম্মদ নাসির নামে এক যুবদলকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যা এই চৌমুহনী বাজার থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত রাউজান উপজেলায় অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি খুনের পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের যোগসূত্র রয়েছে। একই সময়ে এই অঞ্চলে শতাধিক ছোট-বড় গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।
খুনিদের শনাক্তের দাবি পুলিশের
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর ইসলাম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই ঘটনার সাথে জড়িত ৩ থেকে ৪ জন শুটারের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা সবাই স্থানীয় রাউজান এলাকারই বাসিন্দা। খুনিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে।
তবে আসামিরা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে রাজি হননি তিনি। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, রাজনৈতিক পূর্বশত্রুতা কিংবা স্থানীয় বালু ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















