বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে আটক করা হয়। গত ১২ই জুন একটি চিঠির মাধ্যমে দুবাই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বেনজীর আহমেদকে সুনির্দিষ্ট কোন মামলার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাঁকে কখন দেশে ফিরিয়ে আনা হবে—সে বিষয়ে সরকারের নীতিবান পর্যায় থেকে এখনও স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপের কথা জানানো হয়নি।
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খতিয়ান প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরপরই তিনি গোপনে দেশত্যাগ করেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
ইন্টারপোলের পরোয়ানা ও দুবাইয়ে আটক
দুদকের অনুরোধে গত বছরের ১০ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের একটি আদালত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিলেন। সেই পরোয়ানার সূত্র ধরেই দুবাই পুলিশ এই প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে ঢাকা নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। যেহেতু দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ বা আইনি সহায়তার বিভিন্ন দিক রয়েছে, তাই তাঁকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি আইনি নিয়ম মেনেই সম্পন্ন করা হবে।
৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুদকের মামলা
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরুর পর ২০২৪ সালের ১৫ই ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজধানী ঢাকার একটি বিশেষ আদালতে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে। এই মামলাগুলোতে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং তাঁদের দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, এই পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য গোপনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
-
বেনজীর আহমেদ: ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি costume ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।
-
জীশান মীর্জা (স্ত্রী): ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
-
ফারহীন রিশতা (বড় মেয়ে): তাঁর নামে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক।
-
তাহসীন রাইসা (মেজ মেয়ে): ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাঁকে আসামি করা হয়েছে।
ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংক হিসাব ক্রোকের নির্দেশ
বেনজীর আহমেদ দেশ ছাড়ার পর তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আদালতের নির্দেশে ক্রোক করা শুরু হয়। ২০২৪ সালের ১২ই জুন আদালত এক আদেশে তাঁদের নামে থাকা ৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি জব্দের নির্দেশ দেন। ঢাকার বাড্ডা ও আদাবর এলাকায় এই ফ্ল্যাটগুলো অবস্থিত। এছাড়া জমিগুলো রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা ও পর্যটন জেলা বান্দরবানে।
পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফায় আদালত বড় ধরনের ক্রোকের আদেশ জারি করেন। এর মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ছড়িয়ে থাকা ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার এবং গুলশানের ৪টি অভিজাত ফ্ল্যাট। শুধু তাই নয়, তাঁদের ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি সচল ব্যাংক হিসাব এবং শেয়ার ব্যবসার ৩টি বিও হিসাব (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) পুরোপুরি অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার আদেশ দেওয়া হয়।
ক্ষমতার চূড়া থেকে পতনের খতিয়ান
বাংলাদেশ পুলিশে বেনজীর আহমেদ ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত এক চরিত্র। ২০২০ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পুলিশের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব সামলেছেন।
তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি এতটাই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ উঠলেও তা চাপা পড়ে থাকত। তবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে, তাতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এক সময়ের প্রভাবশালী এই পুলিশ প্রধানের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে কত দ্রুত তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















