অস্কারজয়ী নোলানের সফলতার গল্প: ৬ হাজার পাউন্ড থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার
পর্দায় নোলানের সিনেমা মানেই এক অদ্ভুত সম্মোহন, অদম্য রোমাঞ্চ আর বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা। যার ঝুলিতে আজ রয়েছে দু-দুটি অস্কার এবং ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বক্স অফিস আয়, তাঁর শুরুটা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না।
অল্প বাজেটে অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে যিনি প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ক্রিস্টোফার নোলান আজ হলিউডের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী পরিচালক। সম্প্রতি তাঁর পরিচালিত নতুন সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সিনেমাটি বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশ করবে।
ব্যর্থতা থেকেই সাফল্যের সূচনা
আজ নোলান যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম আর মেধার গল্প। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, বিশ্বের অন্যতম সেরা এই নির্মাতার কোনো প্রথাগত ফিল্ম স্কুলের ডিগ্রি নেই। চলচ্চিত্রে পড়ার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দু-দুবার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল তাঁকে।
কিন্তু এই ব্যর্থতায় তিনি দমে যাননি। ফিল্ম স্কুলে ঠাঁই না পেয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শুরু করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে নিজের মতো করে শুটিংয়ের কাজ চালিয়ে যান।
ছাত্রাবস্থাতেই নোলান একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন—নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে এই প্রতিযোগিতার বিশ্বে কেউ জায়গা দেবে না। তিনি জানতেন, সামান্য ভিত্তি তৈরি করতে না পারলে স্বপ্নের কোনো মূল্য নেই। কারণ, হলিউডে প্রতিবছর হাজারো তরুণ সিনেমা বানাতে আসেন, যাদের ৯৯ শতাংশই হারিয়ে যান। নোলান নিজেকে সেই তালিকায় দেখতে চাননি।
অল্প বাজেটের ‘ফলোয়িং’ থেকে টার্নিং পয়েন্ট
১৯৯৮ সালে মাত্র ছয় হাজার পাউন্ডের স্বল্প বাজেটে নোলান নির্মাণ করেন তাঁর প্রথম সিনেমা ‘ফলোয়িং’। অভিনয়ে ছিলেন তাঁর বন্ধু ও পরিচিতরা, যাঁরা অন্য চাকরি করতেন বলে কেবল ছুটির দিনে শুটিং হতো।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ছবিটি মাত্র ৪৮ হাজার ডলার আয় করলেও, নোলানের মেধা নজর কাড়ে বিশ্বখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রসের। আর সেটিই বদলে দেয় তাঁর জীবনের মোড়।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মেমেন্টো’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের আকাশে তাঁকে এক উদীয়মান তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০০৬ সালে ‘দ্য প্রেস্টিজ’ এবং ২০০৮ সালে ‘দ্য ডার্ক নাইট’ বানিয়ে তিনি নির্মাণশৈলীর এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেন।
নোলান মূলত ব্যাটম্যান ট্রিলজি বানাতে রাজি হয়েছিলেন বড় বাজেটের মৌলিক সিনেমা করার সুযোগ পাওয়ার আশায়। তাঁর সেই বাজি পুরোপুরি সফল হয়। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ শুধু সুপারহিরো সিনেমার ধারণাই বদলে দেয়নি, বরং আইম্যাক্স প্রযুক্তিকে নিয়ে আসে মূলধারার চলচ্চিত্রে।
কেন তিনি আলাদা?
কুবরিক, রিডলি স্কট কিংবা অরসন ওয়েলসের দর্শনে অনুপ্রাণিত নোলানের কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জটিল গল্পকে দারুণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা। সময়, স্মৃতি আর মানবমনের সংকট বারবার ফিরে এসেছে তাঁর কাজে।
ডিজিটাল দুনিয়ার ভিএফএক্স নির্ভরতার যুগেও তিনি পছন্দ করেন বাস্তব লোকেশনে আইম্যাক্স ক্যামেরায় শুটিং করতে। সিনেমা চলাকালীন দ্বিতীয় কোনো ইউনিট ব্যবহার না করে প্রতিটি শট নিজে তদারকি করার মতো একাগ্রতাই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
একদা ফিল্ম স্কুলে সুযোগ না পাওয়া সেই তরুণ আজ প্রমাণ করেছেন—প্রতিভা, দৃষ্টিভঙ্গি আর অদম্য ইচ্ছা থাকলে নিজের নামকেই একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 

























