বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চলতি সপ্তাহে আরও কমে গেছে। একই সময়ে এই কৌশলগত জলপথ পরিচালনার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই করিডোরে চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র আটটি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হয়েছে, যা আগের সপ্তাহগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর আগে মঙ্গলবার এই সংখ্যা ছিল পনেরোটি, আর তার আগের বৃহস্পতিবার ছিল বারোটি। উত্তেজনা শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশ চল্লিশটি বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত বলে জানা গেছে। বর্তমান পরিসংখ্যান সেই স্বাভাবিক প্রবাহের তুলনায় বিশাল ব্যবধান তুলে ধরছে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশের কাছাকাছি বহন করে থাকে এমন একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিচালিত হয়। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচলে যেকোনো ব্যাঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে এবং তেলের আন্তর্জাতিক মূল্যে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে ওমানের সঙ্গে এই জলপথ পরিচালনা সংক্রান্ত সমঝোতার উদ্যোগকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা উত্তেজনা প্রশমনে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি, এবং এটি কার্যকর হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, দক্ষিণ লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় কমেছে। কেপলারের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার এই প্রণালি দিয়ে ছাব্বিশটি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে মঙ্গলবার এই সংখ্যা ছিল বত্রিশটি এবং বুধবার ছিল বাইশটি। ধারাবাহিক এই পতন এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি পতাকাবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দেওয়ার আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সত্তরটি জাহাজ বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেই তুলনায় বর্তমান সংখ্যা অনেকটাই কম, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এই জলপথেও শিপিং কোম্পানিগুলো এখনো ঝুঁকি এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—এই দুই কৌশলগত জলপথে জাহাজ চলাচল একযোগে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে, কারণ এই দুই জলপথের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য। আগামী দিনগুলোতে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা কতটা কার্যকর হয় এবং তা জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে কতটা ভূমিকা রাখে, সেদিকেই এখন সবার নজর।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 





















