হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে নতুন নাসাউ কাউন্টি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এই ঘোষণার ইঙ্গিত দেন।
বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান বর্তমানে খুবই খারাপভাবে পরাজিত হচ্ছে এবং শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। তিনি আরও দাবি করেন, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি দিলেই কেবল কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট বলে অভিহিত করে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ এখনো মেটেনি, বরং তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৬৬ দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩ হাজার ৩৭১টি জাহাজ চলাচল করেছে। এই সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ, যা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে এই সংকটের গভীর প্রভাব স্পষ্ট করে তোলে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এরপর ১৭ জুন দুই দেশ একটি চুক্তিতে সই করে এবং চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করে। তবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচলের অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, যার জেরে আলোচনা ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে জুলাই মাসে। ৮ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা চালায়। এই সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। জবাবে তেহরান দাবি করে, জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম রয়েছে, এবং এসব স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
এই ধারাবাহিক উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম ও কৌশলগত জলপথ হওয়ায় এখান দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। ফলে এই জলপথ নিয়ে কোনো একতরফা ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের মধ্যেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, কিংবা তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা মেলেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















