চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডে গ্যাস দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে সাত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাতে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
শুক্রবার সকালে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কারখানায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোরের দিকে একদল শ্রমিক একটি পুরোনো জাহাজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কাজ চলাকালীন হঠাৎ জাহাজের একটি ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে থাকেন এবং একে একে অচেতন হয়ে পড়েন।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে উদ্ধারকর্মীরা প্রাথমিকভাবে তিনজন শ্রমিকের নিথর দেহ উদ্ধার করেন। এরপর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা বাকি শ্রমিকদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই কিংবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়, ফলে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে। চিকিৎসকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আহতদের কারও কারও অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম সাত শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলেই তিনজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই কারখানার সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে যাতে নতুন করে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের কারণেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে এবং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ উঠে আসছে। পুরোনো জাহাজের ট্যাংক ও কক্ষে দীর্ঘদিন জমে থাকা রাসায়নিক পদার্থ ও গ্যাস অনেক সময় শ্রমিকদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এ ধরনের কারখানায় কাজ শুরুর আগে গ্যাস পরীক্ষা ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এর আগেও এই এলাকার বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে গ্যাস দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। তারপরও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ তাদের। এ ঘটনার পর শ্রমিক পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর শোক ও ক্ষোভ। অনেকে দাবি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বহনেরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক অধিকারকর্মীরা।
ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানানো হবে। এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হলেও চিকিৎসাধীন আহতদের অবস্থা বিবেচনায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















